
সৈয়দ মোহাম্মদ ইমরান হাসান, জেলা প্রতিনিধি, নরসিংদী:
নরসিংদীর নিরালা আবাসিক হোটেলের কক্ষে আলমগীর হোসেন (৩০) নামে এক কর্মচারীকে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে হোটেল মালিকের ছেলে জাহিদ সরকার। শনিবার (৩০ আগস্ট) দিনব্যাপী পৌর শহরের বাজিরমোড় এলাকায় নিরালা আবাসিক হোটেলে এ ঘটনা ঘটে। সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি সকলের নজরে আসে। ফেসবুকে নির্যাতনের পৈশাচিকতা দেখে মানুষ আতকে উঠেছে।
অভিযুক্ত জাহিদ সরকার (২৮) নরসিংদী বৌয়াকুড় এলাকার ও নিরালা আবাসিক হোটেলের মালিক জাহাঙ্গীর সরকারের ছেলে। আর নির্যাতিত আলমগীর হোসেন শহরের বানিয়াছল এলাকার হারিছ মিয়ার ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, আহত আলমগীর হোসেন শহরের বানিয়াছল এলাকায় জাহাঙ্গীর সরকারের মালিকানাধিন ‘নিরালা হরিণ বাড়ী‘ নামে একটি খামারের দেখা-শোনার দায়িত্বে ছিলেন। সম্প্রতি এই খামার থেকে জেনারেটরের একটি ব্যাটারি চুরি হয়ে যায়। এ ঘটনায় খামারের মালিকের ছেলে জাহিদ সরকার কর্মচারী আলমগীকে সন্দেহ করে। এরই জের ধরে শনিবার (৩০ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে আলমগীরকে ডেকে তাদের নিরালা আবাসিক হোটেলে নিয়ে যায়। সে হোটেলের গেলে পূর্ব থেকে উতপেতে থাকা জাহিদ সরকার ও তার লোকজন তাকে ধরে জোরপূর্বক পঞ্চম তলার স্টোর রুমে নিয়ে যায়। সেখানে তার গলায় রশি দিয়ে জানালার গ্রীলের সাথে বেধে লোহার পাইপ দিয়ে বেধরক পিটাতে থাকে। এক পর্যায়ে জাহিদ সরকার ধারালো ছুড়ি দিয়ে আলমগীরের শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। পরে একই এলাকার শাকিল নামে অপর একটি ছেলেকে হোটেলে ডেকে এনে জাহিদ তাকেও বেধরক মারধোর করে। এক পর্যায়ে শাকিলের হাতে একটি স্টিলের পাইপ দিয়ে আলমগীরকে মারতে বলে এবং সে মারধোরের ভিডিও ধারণ করে জাহিদ সরকার। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় আলমগীরকে শাকিলের মাধ্যমে বাড়ি পাঠায়। পরিবারের সদস্যরা তার এ অবস্থা দেখে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিতসক তাকে ঢাকায় রেফার্ড করে। পরে তাকে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে সেখানে চিকিতসাধিন রয়েছেন।
এ ঘটনায় সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে নরসিংদী মডেল থানায় আলমগীরের পিতা হারিছ মিয়া বাদি হয়ে জাহিদ সরকারকে প্রধান আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্যান্য আসামীরা হলো-সিয়াম, আল আমিন ও শাকিল।
সরেজমিনে মঙ্গলবার বিকেলে শহরের বানিয়াছল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিরালা হরিণ বাড়ীটি তালাবদ্ধ রয়েছে। আলমগীরের কথা জিজ্ঞাস করতেই এলাকাবাসী ও তার পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে আসে। তারা জানায় আলমগীর খুবই দরিদ্র পরিবারের ছেলে। এখানে কাজ করে সংসার চালাতেন। সে খুবই ভাল ছেলে এবং কোনো খারাপ কাজের সাথে জড়িত নয়। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে এমন নির্যাতন করা হয়েছে।
এব্যাপারে মঙ্গল মিয়া নামে একজন এলাকাবাসী বলেন, আলমগীর যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, তবে দেশে আইন রয়েছে, এভাবে নির্যাতন না করে তাকে আইনের হাতে তুলে দিতো। কিন্তু তাকে নির্যাতন করে খুবই নৃশংসভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। এই ঘটনায় আমাদের এলাকার শাকিল নামে অন্য একটি ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে।
আলমগীরের পিতা হারিছ মিয়া বলেন, আমার ছেলেকে হোটেলের রুমে আটকে গলায় রশি দিয়ে জানালার সাথে বেধে লোহার পাইপ দিয়ে বেধরক পিটিয়েছে। পরে জাহিদ ধারালো ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গলা থেকে পা পর্যন্ত রক্তাক্ত জখম করে। পরে আমার ছেলের শরীরে থাকা রক্তমাখা শার্ট ও প্যান্ট খুলে রেখে ডেকোরেটরের কাপড় পড়িয়ে শাকিলকে দিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় আমাদের বাড়িতে পাঠায়। শুনেছি তার শরীর থেকে খুলে রাখা রক্তমাখা কাপড়গুলো পুড়িয়ে ফেলেছে। এমনকি ডাক্তার দেখালে এবং পুলিশের কাছে গেলে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিয়েছে।
তার মা সমলা খাতুন বলেন, আমার ছেলে জীবন ভিক্ষা চেয়েছে, তারপরও তাদের মন গলেনি। তারা আমার ছেলের দুই হাত ভেঙ্গে দিয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরি দিয়ে রক্তাক্ত জখম করেছে। আমরা গরীব মানুষ, ওদের সাথে ক্ষমতায় পারবো না। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।
এব্যাপারে হোটল মালিক জাহাঙ্গীর সরকার ও তার ছেলে জাহিদ সরকারের মোবাইল ফোনে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং তাদের হোটেলে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হক বলেন, এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ৩১ মে এ হোটেলের নীচতলার একটি কক্ষ থেকে জানালার সাথে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া মরদেহটিও হোটেলের কক্ষের জানালার সাথে রশি দিয়ে গলায় পেঁচানো ছিল।





























