
মো আনিছুর রহমান (স্টাফ রিপোর্টার) ব্রাহ্মণবাড়িয়াঃ
আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়ার প্রস্তাবে পূর্ব–বাংলার নতুন অর্থনৈতিক করিডর গঠনের বিশ্লেষণ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সদস্য এবং ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়া সম্প্রতি বেপজার কাছে কসবা উপজেলার তিন লাখ পীর এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তার লক্ষ্য স্পষ্ট—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্তত কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সীমান্তবর্তী পূর্ব–বাংলাকে ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে এক নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলা।
প্রস্তাবটি এখন শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়; ভৌগোলিক সুবিধা, অবকাঠামোগত অগ্রগতি, শ্রমবাজারের বিশালতা, রপ্তানি-ভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক মডেলের আলোকে এটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময়। ইতিমধ্যে বেপজা প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছে এবং দেশে–বিদেশে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
ভৌগোলিক সুবিধা: আখাউড়া সীমান্ত ঘিরে নতুন ট্রেড গেটওয়ে
কসবার তিন লাখ পীর এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকরিডরের কেন্দ্রবিন্দু।
মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই রয়েছে আখাউড়া আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর; আর সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা, যার রাজধানী আগরতলা মাত্র ২৫–৩০ মিনিটের পথ। আখাউড়া–আগরতলা ডুয়েল গেজ রেললাইন
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক নিকটবর্তীতা ঢাকামুখী নতুন এক্সপ্রেসওয়ের উন্নয়নকাজ এ সব মিলিয়ে কসবা ইপিজেডের অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মানের শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার জন্য ব্যতিক্রমীভাবে উপযোগী করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়—“অবস্থানই হচ্ছে সবচেয়ে বড় মূলধন”—আর কসবা সেই মূলধনেরই স্বর্ণভূমি। শ্রমবাজার:কয়েক লাখ কর্মসংস্থানের বাস্তব ভিত্তি
৩৫–৪০ লাখ জনসংখ্যার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমঘন এলাকা। এখানে ১৮–৪০ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৫–১৮ লাখ।
কসবা–আখাউড়া অঞ্চলে অন্তত ২–২.৫ লাখ যুবক নতুন কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় ত্রিপুরা ও আসামের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকেও বহু শ্রমিক কাজ করতে আগ্রহী
ইপিজেড হলে সরাসরি ২.৫–৩ লাখ চাকরি
আনুষঙ্গিক সেবা খাতে (লজিস্টিকস, ব্যবসা, সাপ্লাই চেইন, আবাসন, পরিবহন) আরও ২–২.৫ লাখ কর্মসংস্থান
অর্থাৎ পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষ পরিবর্তন আনবে এ শিল্পাঞ্চল।
সম্ভাব্য শিল্প: কোথায় সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা?
১. গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ভ্যালুচেইন
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮৪% আসে টেক্সটাইল খাত থেকে। কসবা ইপিজেড হবে ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে নিকটবর্তী গার্মেন্টস উৎপাদন কেন্দ্র।
২. লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও অটোমোটিভ কম্পোনেন্ট
ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডরের নিকটবর্তীতা ছোট যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য কসবাকে উপযোগী করে।
৩. ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলি জোন
মোবাইল, LED পণ্য, হোম অ্যাপ্লায়েন্স—সব ধরনের অ্যাসেম্বলি প্লান্ট এখানে স্থাপন করা সম্ভব।
৪. এগ্রো–প্রসেসিং ও খাদ্যশিল্প
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ধান, মাছ, সবজি ও দুধ উৎপাদনে সমৃদ্ধ। ইপিজেড–ভিত্তিক ফুড–প্রসেসিং প্লান্ট সরাসরি স্থানীয় কৃষিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে।
৫. লজিস্টিকস ও বর্ডার–ট্রেড হাব
আখাউড়া স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হবে ফ্রেইট–ফরওয়ার্ডিং, ওয়্যারহাউজিং, ট্রান্সশিপমেন্ট ও কোল্ড–স্টোরেজ ক্লাস্টার।
কৌশলগত গুরুত্ব: কেন কসবা ইপিজেড বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য?
১. পূর্ববাংলার প্রথম বৃহৎ বর্ডার–ইকোনমিক জোন
ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ।
২. আঞ্চলিক ভারসাম্য উন্নয়ন
শিল্পায়ন এখনো ঢাকা–গাজীপুর–নারায়ণগঞ্জভিত্তিক। কসবা এই মানচিত্রে নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে।
৩. ভারত–বাংলাদেশ বাণিজ্য নতুন মাত্রায়
ত্রিপুরা ও আসাম থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়। কসবার উৎপাদন কেন্দ্র রফতানি বাড়িয়ে দেবে বহুগুণে।
৪. স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও রেমিট্যান্স নির্ভরতা কমানো
প্রবাসনির্ভর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অর্থনীতি দেশীয় কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত পাবে।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ: কী শেখা যায়?
শেনঝেন ইকোনমিক জোন (চীন)
এক সময় ছোট শহর হলেও আজ ৪৮০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কেন্দ্র। সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকেও কিভাবে বৈশ্বিক শিল্পশক্তি গড়ে ওঠে—শেনঝেন তার বড় উদাহরণ।
ভিয়েতনামের হো চি মিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর
FDI ২০ বছরে ২০ গুণ বেড়েছে। টেক্সটাইল–ভ্যালুচেইন বাংলাদেশকে সরাসরি অনুপ্রেরণা দেয়।
গুজরাটের মুন্দ্রা–দাহেজ মডেল (ভারত)
স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সমন্বয়—কসবা একই ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
মালয়েশিয়ার পেনাং ফ্রি ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন
“সিলিকন ভ্যালি অফ দ্য ইস্ট”—ইলেকট্রোনিক্স উৎপাদনে কসবাও এর আদলে এগোতে পারে।
বাজার লক্ষ্য: কারা হবে কসবা ইপিজেডের প্রধান ক্রেতা?
ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চল: ৪.৫–৫ কোটি মানুষের বাজার
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পাঞ্চল
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের গার্মেন্টস ও খাদ্য বাজার
গ্লোবাল সাপ্লাই–চেইনে আগ্রহী বহুজাতিক কোম্পানি
আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়ার নেতৃত্ব: উন্নয়নদর্শনের রাজনৈতিক প্রসঙ্গ
কবীর আহমেদ ভূঁইয়া কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি একজন উন্নয়নদর্শী উদ্যোক্তা ও অঞ্চলপ্রেমী চিন্তক।
ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বহু বছর ধরে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ–সহায়তা ও যুবউন্নয়নে তার ভূমিকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
কসবা ইপিজেড বাস্তবায়িত হলে এটি হবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ইতিহাসে প্রথম মেগা ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর—যা ভবিষ্যতে পূর্ববাংলাকে “ইস্টার্ন ইকোনমিক পাওয়ারহাউস” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
নীতি–প্রস্তাব: প্রকল্প সফল করতে প্রয়োজনীয় কাঠামো
১. ১০০০–১৫০০ একর জমিতে বহুমুখী শিল্পাঞ্চল
২. ওয়ান–স্টপ সার্ভিস সেন্টার
৩. আখাউড়া স্থলবন্দর–কেন্দ্র




























