
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নিয়ে কিশোরগঞ্জে এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৩ মে ২০২৬) সকাল ১১টায় জেলা তথ্য অফিসের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে জেলার সিনিয়র সাংবাদিক, টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মীসহ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।জেলা তথ্য অফিস, কিশোরগঞ্জ আয়োজিত এ প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থাপনা করেন সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. আসাদুজ্জামান কাউছার। তিনি সরকারের বিভিন্ন অগ্রাধিকার কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, কৃষি সহায়তা, খাল ও নদী পুনঃখনন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জেলা তথ্য অফিসের প্রচার কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেন।বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার একাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকারের “ফ্যামিলি কার্ড” কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশের ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলাও এই পাইলট প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ভৈরবের ১ হাজার ১০টি পরিবার এই সুবিধা পাচ্ছে এবং প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।কৃষকদের জন্য “কৃষক কার্ড” কার্যক্রমের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলায় ২২ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মাঝারি কৃষকের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। কৃষির পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের খামারিরাও এ সুবিধার আওতায় আসছেন।প্রেস ব্রিফিংয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কৃষিখাতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও তুলে ধরা হয়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১২ হাজার ৫২২ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫০ হাজার ৫ জন কৃষক। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানানো হয়।এছাড়া কৃষি ঋণ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় কিশোরগঞ্জ জেলার ২৬ হাজার ৭৬৪ জন কৃষকের সুদসহ প্রায় ২২ কোটি ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৪০৭ টাকার কৃষি ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।দেশব্যাপী নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক খাল পুনঃখননের তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে হোসেনপুর উপজেলার ফটিকখালি ব্রিজ থেকে পানান বিল পর্যন্ত খাল, সৈয়দপুর-লাখুহাটি হয়ে পানান বিল পর্যন্ত খাল, গজারিয়া খাল, সোনাদল খাল, কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুড়ি এলাকার খাল, নিকলীর পাগলা খাল ও আরিবিল খাল, বাজিতপুরের শিয়ালদি খাল এবং ভৈরব উপজেলার গোছামারা ও নালি খাল।বক্তারা জানান, এসব খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হলে কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, জলাবদ্ধতা কমবে এবং মৎস্য উৎপাদনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।প্রেস ব্রিফিংয়ে কিশোরগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর নাব্য সংকটের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। নরসুন্দা, ফুলেশ্বরী, ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদী ড্রেজিংয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়। বিশেষ করে নরসুন্দা নদীর উৎসমুখ খনন, ফুলেশ্বরী নদীর শুকিয়ে যাওয়া অংশ পুনরুদ্ধার এবং ধলেশ্বরী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সরকারের উদ্যোগের বিষয়টিও প্রেস ব্রিফিংয়ে গুরুত্ব পায়। জানানো হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।কিশোরগঞ্জ জেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে বাজিতপুরে ২৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা, ভৈরব উপজেলায় সৌরচালিত সেচ প্রকল্প এবং করিমগঞ্জে সৌর পাম্পের মাধ্যমে কৃষি সেচ কার্যক্রমের বিষয় তুলে ধরা হয়।এছাড়া হজযাত্রীদের জন্য “নুসুক হজ কার্ড” চালু, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদ পূরণে কর্মপরিকল্পনা, বন্ধ সরকারি শিল্পকারখানা চালু, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার তৈরির উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।শিক্ষা খাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, জুতা ও পাটের তৈরি ব্যাগ বিতরণ, “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প এবং “নতুন কুঁড়ি” প্রতিযোগিতা পুনরায় চালুর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এবার “নতুন কুঁড়ি” প্রতিযোগিতায় ক্রীড়া ও কোরআন তেলাওয়াত বিভাগও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়।আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ চারা উৎপাদন করা হয়েছে বলেও প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। বর্ষা মৌসুমে এসব চারা রোপণ করা হবে এবং শহরের খালের পাশে হাঁটার রাস্তা ও আধুনিক নেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা চালু, নামজারি আবেদন অনলাইনে বাধ্যতামূলক করা এবং ডিজিটাল সার্ভে কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালুর তথ্য জানানো হয়।প্রেস ব্রিফিংয়ের শেষাংশে জেলা তথ্য অফিস, কিশোরগঞ্জের গত তিন মাসের প্রচার কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, এ সময়ে ২টি মহিলা সমাবেশ, ১টি ফ্যামিলি সমাবেশ, ১০টি উন্মুক্ত বৈঠক, ১৭৫টি চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, ৬০ ইউনিট সড়ক প্রচার, ১০৯টি অনলাইন কনটেন্ট প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।শেষে সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. আসাদুজ্জামান কাউছার সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান।





























