
মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি: কুমারী পরিচয়ে ভুয়া নামে একাধিক যুবককে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে বিয়ের ফাঁদে ফেলে অর্থ-সম্পদ লুট, ও নিরীহ লোকদের মামলায় ফেলে হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছে সাথী (২৪) নামে এক নারীর বিরুদ্ধে। তার ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন একাধিক যুবক।তার এই প্রতারণা ও জালিয়াতিসহ অপকর্মের দায়ে তাকে গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তির দাবি করেন সাথীর সাবেক স্বামী নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার জয়পুর গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মো. মিজানুর রহমান।মিজানুর বলেন, নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার সাওতা ইউনিয়নের মানকান্দিয়া গ্রামের মো. মোফাজ্জলের মেয়ে সাথী এ পর্যন্ত ৪ এর অধিক বিয়ে করেছেন। ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ভুয়া নামে জুলহাসকে বিয়ে করে। যদিও পরে টাকা দিয়ে জুলহাস তাকে বিদায় করেছে। বিয়ে করে কিছুদিন পর সেই স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে প্রথম বিবাহিতা পরিচয়ে আমাকে বিয়ে করে। বিষয়টি আমি বিয়ের কিছুদিন পর জানতে পারি। এবং কোর্টে যৌতুকের মামলা করে। ছেলেদের কাছ থেকে দেনমোহরের টাকাসহ নানা কৌশলে বাড়ি-গাড়ি হাতিয়ে নেওয়াই সাাথীর ব্যবসা।তার মূল টার্গেট সম্পদশালী ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ চাকরিজীবী ও প্রবাসী পুরুষ। প্রথমে টার্গেট নিশ্চিত করে পরে ধীরে ধীরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে নিজ দেহের সৌন্দর্য ও কথা মালার মারপ্যাঁচে আটকে ফেলেন টার্গেটকৃত পুরুষদের।২০২০ সালে মোছা: সুমা আক্তার ভুয়া নামে কুমারী পরিচয়ে ব্ল্যাকমেইল করে রাতারাতি বিয়ে করে নেত্রকোনার সদর বড়গাড়া গ্রামের এখলাছ উদ্দিনের ছেলে মো. জুলহাসকে। নিকাহনামা অনুযায়ী সুমা'র বয়স ছিলো তখন ২২ বছর ৫ মাস ১৯ দিন। সপ্তাহখানেক যেতে না যেতেই স্বামীর ঘর থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যায় তিনি। প্রতিবেদকের হাতে আসা জাতীয় এনআইডি কার্ডে তার আসল নাম সাথী। বিয়েটি সম্পাদন করেছিলেন কাজী আব্দুল আল মামুন। নিকাহনামার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২১ জুন বিয়ের চূড়ান্ত তারিখ এবং কাবিন নম্বর ‘এ’, পৃষ্ঠা নম্বর ৪০ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।জুলহাসের সাথে বিবাহের ১১ মাস ৬ দিন পর আরেক বিয়ে করে ২০২১ সালের ২৭ মে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ৫নং সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামের মো.সাইফুল ইসলামের ছেলে মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে। নিকাহনামা অনুযায়ী তখন তার বয়স ২৩ বছর ৪ মাস ২৫ দিন। সাথী প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নিকাহনামায় নিজেকে 'প্রথম বিবাহিতা’ দাবি করে মিজানের সঙ্গে তিন লক্ষ টাকার কাবিননামায় এক লক্ষ টাকা তলব দিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সাথী। বিয়ের কাবিননামা প্রথম বিবাহ লেখা তাকলেও এটি ছিল সাথীর দ্বিতীয় বিবাহ। কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে সাথীর উশৃংখল জীবনযাপন এবং উগ্র আচরণের শিকার হন স্বামী মিজানুর। একপর্যায়ে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ নিয়ে স্বামী মিজানের বাড়ি থেকেও বেরিয়ে যান। এ ঘটনায় একই বছরের ১০ ডিসেম্বর মিজানুর তাকে তালাক দেন। যদিও পরবর্তীতে তার কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে ২০২৫ সালে মিজানের বিরুদ্ধে যৌতুকের এবং পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন সাথী। এই বিয়েটি সম্পাদন করেছিলেন কাজী মো: মুতি উল্লাহ। নিকাহনামার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২৭ জুন বিয়ের চূড়ান্ত তারিখ এবং কাবিন নম্বর ‘১’, পৃষ্ঠা নম্বর ৮৩ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।সাথী আক্তার কর্তৃক প্রতারণার শিকার তার দ্বিতীয় স্বামী মিজানুর অভিযোগে উল্লেখ করে বলেন, সাথী নিজেকে কুমারী দাবি করে এর আগে কাবিননামায় মোছা: সুমা আক্তার (ভুয়া) নামে কুমারী পরিচয়ে জুলহাস মিয়া নামের এক ছেলেকে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে বিয়ে করে। এরপর জাতীয় এনআইডি কার্ডের নাম অনুযায়ী সাথী আমার সাথে প্রথম বিয়ে কুমারী পরিচয়ে বিয়ে করে। এভাবে একাধিক পুরুষের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর তাদের প্রতি জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই তার নেশা। বিগত প্রত্যেক স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাদের বেকায়দায় ফেলতে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার ভয় দেখিয়ে স্বার্থ হাসিল করাই তার পেশা।ব্ল্যাকমেইলের মাধমে ভুয়া নামে বিয়ে করা সুমা আক্তারের আগের স্বামী জুলহাস মিয়া বলেন, "আমার সাথে পরিচয় ছিল ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে রাতে আমাকে একটা বিয়ে করায়। তারপর আমি এবং আমার পরিবার এটা মেনে নেইনাই। জোরপূর্বক আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। পরে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে কাবিননামাটি ছিল তার ভুয়া নামে। পরে টাকা দিয়ে তাকে বিদায় করা হয়েছে। টাকার অংক মোটা, এটা বলা যাবেনা। এগুলো পঁচা শামুক এটি নিয়ে এখন আর কথা বলতে চাচ্ছিনা।"মিজানুর বলেন, সাথী এর আগে আরও একাধিক ছেলেকে বিয়ে করেছে। এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে তিনি এভাবে একের পর এক ছেলেদেরকে বিয়ের ফাঁদে ফেলে তাদের অর্থ-সম্পদ লুটে নেবে। অবিলম্বে তাকে গ্রেফতার পূর্বক সাথী সহ তার পরিবারের সব সদস্যদের অপকর্ম তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি করেন তিনি।আইনের ৪৯৫ ধারা অনুযায়ী আগের বিয়ের কথা গোপন রেখে, প্রতারণার মাধ্যমে যদি পুনরায় বিয়ে করে তবে যাকে প্রতারণা করে বিয়ে করা হল-তিনি অভিযোগ করলে তা ৪৯৫ ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।সুমার বিবাহের কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, " এটি ২০২০ সালের ঘটনা। অনেক দিন আগের ঘটনা এখন এত কিছু মনে নেই। আমার মনে হচ্ছে সে যেহেতু প্রতারক, সে ক্ষেত্রে একেক জায়গায় বিয়ে বসবে আর দেনমোহর টাকা নিয়ে চলে যাবে। এই হিসাবে এনআইডিকার্ড মনে হয় কয়েকটা করছে। আমার মনে হয় নাম বদলাইয়া একেক নামে একেকটা এনআইডিকার্ড বানাইছে। নিকাহনামায় প্রথম বিবাহ পরিচয়ে বিবাহের কাজী মুতি উল্লাহ বলেন, "সাথী এর আগে আরো বিবাহ করেছিল। বিয়ের পরে বিষয়টি জানতে পেরেছি। বিষয়টি নিয়ে মামলা চলতেছে। সাথী এর আগে আমার কাছে কয়েকবার এসেছিল। সাথীর যে বিবাহ হয়েছে তা আগে বলে নাই। এ ঘটনায় এর আগে শালিসিও হয়েছে। সাথীর আগের বিয়ের একটি কাবিননামা মিজান আমাকে দেখিয়েছে। পরে বিষয়টি সততা শিকার করেছিল সাথী। এটি নিয়ে মিজানের কাছে মাপও চেয়েছে সাথী।"এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাথী বলেন, "প্রথম বিয়ের বিষয়টি গোপন কিছু নয় এবং এ সংক্রান্ত সমস্ত প্রমাণ ও কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রথম বিয়ের সময় আমার এনআইডিকার্ড ছিলনা। আর তখন আমার বিয়ের বয়স হইছিলনা। এ সময় আমার দুটি নাম ছিল। সেই নাম ‘সুমি’ ব্যবহার করে বিয়ে হয়েছিল। পরবর্তীতে এনআইডিতে ‘সাথী' নাম ব্যবহার করা হয়। আমি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে কষ্ট করে চাকরি করে নিজের চার লাখ টাকা ব্যাংকে জমিয়েছিলাম। সেই টাকার কথা জানতে পেরে এবং আমাদের চার বছরের সন্তানের দোহাই দিয়ে মিজান আমার ওপর মানসিক অত্যাচার শুরু করে। এমনকি বাচ্চার জন্মনিবন্ধনের জন্য বাবা হিসাবে তার এনআইডিকার্ড দিতেও সে টালবাহানা করতেছে।"



























