
লোকসান-উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং অন্য ফসলের দিকে আগ্রহ তৈরি হওয়ায় মুন্সীগঞ্জে কৃষকদের আলু আবাদে আগ্রহ কমেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় বছরে জেলায় ধারাবাহিকভাবে আলু চাষ কমেছে। অন্যদিকে তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় আলু উৎপাদন-পরিবহন ও সংরক্ষণে কৃষকের খরচ বেড়েছে। কৃষি অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, আলু উৎপাদনে শীর্ষ জেলা মুন্সীগঞ্জে প্রতিবছর গড়ে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়। যেখানে জেলার ৬৮টি কোল্ডস্টোরেজের ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন, সেখানে উৎপাদিত বাকি আলু নিয়ে প্রতিবছরই কৃষকের হিমশিম খেতে হয়। আবার কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণে খরচ বাড়ায় কম লাভে খেত থেকেই আলু বিক্রি করে দেন তারা। এতে লোকসানে পড়তে হয়।
জেলায় ২০১৯ সালে ৩৮ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হতো। ২০২৪ সালে এসে দেখা গেছে ৪ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমিতে এখন আর আলু চাষ হচ্ছে না। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রতিনিয়ত আলুর আবাদ কমলেও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে কৃষি অধিদপ্তর। তারা বলছে, যেহেতু কৃষক প্রতিবছরই বলছে আলুতে তাদের লোকসান হচ্ছে তাই তাদের বিকল্প হিসেবে ভুট্টা ও সরিষা চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে তারা সেটি অনুসরণ করছেন। জেলা কৃষি অফিস জানায়, মুন্সীগঞ্জ জেলার ৬টি উপজেলাতে এবছর ৩৪ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেছেন কৃষকরা। এর মধ্যে সদর, টংগিবাড়ী ও সিরাজদিখানে বেশি চাষ হয়েছে। আর দুই সপ্তাহের মধ্যেই জেলাজুড়ে পুরোদমে শুরু হবে আলু উত্তোলন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলের দাম বাড়ায় গত বছরের তুলনায় আলু পরিবহনে কৃষকের দেড় গুণ খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎতের দাম বাড়ায় বস্তাপ্রতি কোল্ডস্টোরেজ ভাড়াও বেড়েছে ২০-৩০ টাকা। কোল্ডস্টোরেজে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে কৃষকের ব্যয় হবে ২৫০-২৭০ টাকা। বাজার ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি আলু বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়। টংগিবাড়ী উপজেলার হাসাইল এলাকার কৃষক আহসান জমাদ্দার জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর খেত থেকে কোল্ডস্টোরেজে আলু পরিবহনের খরচ দেড় গুণ বেড়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাড়তি খরচ বহন করতে হবে কৃষকের। এ ছাড়া গত বছর কোল্ডস্টোরেজ মালিকরা প্রতি বস্তায় ২৬০ টাকা রেট নির্ধারণ করেছিলেন। এ বছর দর আরও বাড়বে। আবির অ্যাগ্রো কোল্ডস্টোরেজের স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেন পুস্তি জানান, বিদ্যুৎতের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে গত বছর ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ বছর এই রেট আরও বাড়তে পারে।
মুন্সীগঞ্জ সদরের মোল্লাকান্দি এলাকার আলুচাষি খোরশেদ ব্যাপারী বলেন, ‘৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ বছর ২০ কানি জমিতে আলু আবাদ করেছি। আলুর পাশাপাশি জমির আইলে সামান্য পরিমাণ সরিষার আবাদ করেছি। ভালো দামে বিক্রি হলে সামনের বছর আলুর আবাদ কমিয়ে সরিষা করব।’
সিরাজদিখানের রশুনিয়া এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর আমি ৪০ শতাংশ জমিতে আলুর আবাদ করেছি। বাকি ২০ শতাংশ জমিতে স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শে সরিষা চাষ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার মতো এই এলাকার অনেক কৃষক আলুর আবাদ কমিয়ে বিকল্প সবজি চাষ করেছে।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. আব্দুল আজিজ বলেন, সার্বিকভাবে যদিও জেলায় আলুর আবাদ কমছে কিন্তু বিষয়টি ইতিবাচক। যেহেতু কৃষকও বলছে, আলুতে তাদের প্রতিবার লোকসান হচ্ছে তাই তাদের আলুর বিকল্প সরিষা, ভুট্টা ও শাকসবজি চাষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কৃষককে বুঝিয়েছি, মুন্সীগঞ্জ আলুর রাজধানী হলেও লোকসান দিয়ে তো আর ব্যবসা করা যাবে না। আলু আবাদ কমে আসছে এটি অবশ্যই ইতিবাচক।’
রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাত উপযোগী আলুর জাত ছাড়করণ ও কৃষকপর্যায়ে জনপ্রিয় করার বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জে বেশি চাষ হওয়া আলুর জাতের মধ্যে একটি হচ্ছে ডায়মন্ড। এ ছাড়া অরিকো, মালতা ও পেরটোনাইস জাতের আলু বেশি চাষ হয় এখানে। অন্যদিকে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য যে জাতগুলো রয়েছে যেমন বিএডিসির সানশাইন, কুইন এনি, বারী আলু-৬২ সেগুলো সম্পর্কে আমরা কৃষককে জানাচ্ছি। উৎপাদন প্রক্রিয়া সেখানোর চেষ্টা করছি। এই জাতগুলোর উৎপাদন বাড়ানো গেলে আলুচাষিরা বেশি লাভবান হবে। অন্যদিকে বিদেশে আলু রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।’





























