
কাগজে-কলমে প্রার্থী ১৯৬ আসনে। বাস্তবে মাঠে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) হাতেগোনা কয়েকজন। তাও নেই কেউ আলোচনায়। ভোটাররা পর্যন্ত চেনেন না। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নির্বাচন ও সরকারের দীর্ঘদিনের ‘বিশ্বস্ত সঙ্গী’ জাতীয় পার্টি কার্যত ভোটে অদৃশ্য।
রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার ভোটাররা জানিয়েছেন, বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তারা পেলেও জাতীয় পার্টির কাউকে প্রচারে দেখছেন না। ঢাকার কয়েকটি আসন সরেজমিনে এ তথ্যের সত্যতাও পেয়েছে স্ট্রিম। তবে জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের ভাষ্য, প্রচারে গেলে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ‘মব’– এর ভয়ে সীমিত আকারে ভোটারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী স্ট্রিমকে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের প্রার্থীরা ছোট ছোট সমাবেশ করছেন। উত্তরবঙ্গের চিত্র আলাদা। সেখানে বড় বড় জনসভা, পথসভা হচ্ছে। মানুষের ভয় কেটে গেলে আমরা যেসব আসনে প্রার্থী দিয়েছি, সেখানে ভালো অবস্থান তৈরি করতে পারব বলে আশাবাদী।
প্রচারে পুরোপুরি না থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মানুষ এখনো জিজ্ঞেস করছে, ভোট হবে কিনা? আমরা মনোনয়ন জমা দিয়েছি, পোস্টার ছাপিয়েছি, বিলবোর্ড-ব্যানার করেছি, বক্তব্য দিচ্ছি। কিন্তু ভোটারদের মনেই প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন হবে তো! ভোটারের মনে সংশয় থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আরেকবার ভেঙে যায় জাতীয় পার্টি। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন প্রয়াত স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ভাই জিএম কাদের; মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। অন্য অংশের নেতৃত্বে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ; মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। দুপক্ষই লাঙ্গল নিজেদের দাবি করে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেয়। তবে ইসির নথিতে রুহুল আমিন হাওলাদার মহাসচিব না থাকায়, এই অংশের মনোনয়ন টেকেনি। পরে তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন গণতান্ত্রিক জোটের অধীনে জেপির (মঞ্জু) সাইকেল প্রতীকে লড়ছেন।
প্রচারে না থাকলেও অভিযোগ এন্তার
রংপুর-৩ আসনে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রচার চালাচ্ছেন। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) রংপুর নগরীর সুপার মার্কেট ও স্টেশন এলাকায় প্রচার চালান তিনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জিএম কাদের বলেন, প্রচারে ভালো সাড়া পাচ্ছি। রংপুর বিভাগের সব আসনে লাঙ্গলের প্রার্থীরা ভালো করবেন। ভোট সুষ্ঠু ও গণনা নিরপেক্ষ হলে আমরা অনেক বেশি আসনে বিজয়ী হব।
এদিকে, ঢাকার ২০ আসনের ১৭টিতে প্রার্থী দিয়েছে জাতীয় পার্টি। তারা হলেন– নাসির উদ্দিন মোল্লা ঢাকা-১, মো. ফারুক ঢাকা-৩, মীর আব্দুস সবুর ঢাকা-৫, আমির উদ্দিন আহমেদ ডালু ঢাকা-৬, সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন ঢাকা-৭, জুবের আলম খান ঢাকা-৮, কাজী আবুল খায়ের ঢাকা-৯, বহ্নি বেপারী ঢাকা-১০, শামীম আহমেদ ঢাকা-১১, সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ঢাকা-১২, হেলাল উদ্দীন ঢাকা-১৪, সামসুল হক ঢাকা-১৫, সুলতান আহম্মেদ সেলিম ঢাকা-১৬, আতিক আহমেদ ঢাকা-১৭, জাকির হোসেন ঢাকা-১৮, বাহাদুর ইসলাম ঢাকা-১৯ ও ঢাকা-২০ আসনে লড়ছেন আহছান খান।
ঢাকা-১৪ আসনের ভোটার মিরপুর-১ নম্বরের বাসিন্দা হোসেন শিকদার স্ট্রিমকে বলেন, ‘সব দল, এমনকি স্বতন্ত্র অনেককে প্রচারে দেখছি। জাতীয় পার্টির প্রার্থী দূরে থাক, তাদের ব্যানার-ফেস্টুনও নেই। নিজেদের কামড়াকামড়িতে ওরা বিচ্ছিন্ন। এবার দলটির কারও জামানত টিকবে বলে মনে হয় না।’ ঢাকা-১০ আসনের ভোটার হাজারীবাগের বাসিন্দা মেঘলা আক্তার বলেন, ‘লাঙ্গলের কোনো ব্যানার-ফেস্টুন নেই। প্রার্থীকেও দেখছি না।’
প্রশ্ন রেখে ঢাকা-১১ আসনের ভোটার আফতাবনগরের বাসিন্দা জওহর দাউদ জিহাদ বলেন, জাতীয় পার্টি কি এবার নির্বাচন দাঁড়াইছে? সবাই জানে দলটি কাদের মদদে চলে এবং কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে? এই নির্বাচনের মাধ্যমে জাপা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ভোটাররা না পেলেও ঢাকার আসনগুলোর একাধিক প্রার্থী স্ট্রিমকে তাদের মাঠে থাকার কথা জানিয়েছেন। ঢাকা-৭ আসনের প্রার্থী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, ‘গণসংযোগ খুব একটা হয়নি। আপাতত বাড়ি বাড়ি আমাদের নারীরা যাচ্ছেন।’ ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী জুবের আলম খান বলেন, ‘ছোট আকারে প্রতিদিন ভোটারের দুয়ারে যাচ্ছি। আমি শান্তির বার্তা নিয়ে সাদা পতাকা ও জাতীয় পতাকা হাতে এই আসনের অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে সাক্ষাতে কথা বলছি।’
ঢাকা-১০ আসনের বহ্নি বেপারী, ঢাকা-১২ আসনের সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ও ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী হেলাল উদ্দীন জানান, তারা চাপের মুখে রয়েছেন। প্রকাশ্যে গণসংযোগ না করে ভোটারের দুয়ারে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী সামসুল হক বলেন, ‘কম-বেশি প্রচার চালাচ্ছি। ব্যানার-ফেস্টুন রাতে লাগাচ্ছি, সকালে তা পাচ্ছি না। গণসংযোগে গেলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পর কিছু সহায়তা মিলেছে।’ ঢাকা-১৭ আসনের আতিক আহমেদ ও ঢাকা-২০ আসনের প্রার্থী আহছান খানের অভিযোগ, কিছু কিছু জায়গায় তাদের ব্যানার কেটে ফেলা হয়েছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা-১৯ আসনে লাঙ্গলের প্রার্থী বাহাদুর ইসলামের অভিযোগ, যারা তাঁর সঙ্গে প্রথম দিন প্রচারে থাকছেন, পরের দিন কী হচ্ছে, ডেকেও পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, মানুষ আমার সঙ্গে কথা বলতে ও পাশে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলে বলছে– ভাই, ভোট কিন্তু আপনাকেই দেব, ডাইকেন না। কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের অদৃশ্য শক্তি বাধা দিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নিবন্ধিত দলের বৈধ প্রার্থীদের নির্বাচন করতে কোনো বাধা নেই। আমরা সবার জন্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করছি। আশা করছি, ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণ ভোট হবে।


































