
সম্প্রতি দেশের বেশকিছু জেলায় রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। ফেসবুকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার কমতি নেই। অনেকেই প্রচার করছেন, সাপটি কামড় দিলে মানুষের দ্রুত মৃত্যু হয়। তবে প্রাণিবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে এই সাপের কামড়ে মৃত্যু হয় না।
দেশের চরাঞ্চল এবং নদীর তীরবর্তী লোকালয়ে সম্প্রতি রাসেলস ভাইপারের উপদ্রব লক্ষ্য করা গেছে। পদ্মা নদীর তীরবর্তী কয়েকটি জেলার মানুষকে এই সাপ দংশন করেছে। তাই রাসেল ভাইপার সাপ নিয়ে এখন আলোচনা ও আতঙ্ক দুটিই ছড়াচ্ছে।
বিষধর সাপ রাসেলস ভাইপার বাংলাদেশে ‘চন্দ্রবোড়া’ বা ‘উলুবোড়া’ নামে বেশ পরিচিত। এই সাপের আদি বাসস্থান ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশই। তবে রাসেলস ভাইপারের চেয়েও বেশি বিষধর দেশে পাওয়া কেউটে সাপ।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রকল্প ভেনম রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ২৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপার আছে। এই সাপ ডিম না দিয়ে একসঙ্গে ২০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত জীবন্ত বাচ্চা প্রসব করতে পারে।
রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা বাড়াতে গত শনিবার এক বিবৃতি দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষের সঙ্গে এই সাপের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এই সাপ সাধারণত নিচু ভূমির ঘাসবন, ঝোপজঙ্গল, উন্মুক্ত বন, কৃষি এলাকায় বাস করে এবং মানুষের বসতি এড়িয়ে চলে। সাপটি মেটে রঙের হওয়ায় মাটির সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারে। মানুষ খেয়াল না করে খুব কাছে গেলে সাপটি বিপদ দেখে ভয়ে আক্রমণ করে। রাসেলস ভাইপার দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় নদীর স্রোতে ও বন্যার পানিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। এ জন্য সবাইকে সাবধানতা অবলম্বনের অনুরোধ জানানো হয়।
সাপের কামড় এড়াতে করণীয় সম্পর্কে বিবৃতিতে বলা হয়, যেসব এলাকায় রাসেলস ভাইপার দেখা গেছে, সেসব এলাকায় চলাচলে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে; লম্বা ঘাস, ঝোপঝাড়, কৃষি এলাকায় হাঁটার সময় সতর্ক থাকতে হবে; গর্তে হাত-পা ঢুকানো যাবে না; সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ করার সময় বুট এবং লম্বা প্যান্ট পরতে হবে; রাতে চলাচলের সময় টর্চ লাইট ব্যবহার করতে হবে; বাড়ির চারপাশ পরিস্কার ও আবর্জনামুক্ত রাখতে হবে; জ্বালানি লাকড়ি, খড় সরানোর সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে; সাপ দেখলে তা ধরা বা মারার চেষ্টা করা যাবে না; প্রয়োজনে জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে কল করতে হবে বা নিকটস্থ বন বিভাগের অফিসকে জানাতে হবে।
সাপ কামড়ালে করণীয় সম্পর্কে বলা হয়, দংশিত অঙ্গ নড়াচড়া করা যাবে না; পায়ে দংশনে বসে পড়তে হবে, হাঁটা যাবে না; হাতে দংশনে হাত নড়াচাড়া করা যাবে না– হাত-পায়ের গিড়া নাড়াচাড়ায় মাংসপেশীর সংকোচনের ফলে বিষ দ্রুত রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে বিষক্রিয়া ঘটতে পারে; আক্রান্ত স্থান সাবান দিয়ে আলতোভাবে ধুতে অথবা ভেজা কাপড় দিয়ে আলতোভাবে মুছতে হবে; ঘড়ি, অলঙ্কার বা তাবিজ থাকলে খুলে ফেলতে হবে; দংশিত স্থানে কাঁটা, সুই ফোটানো কিংবা কোনোরকম প্রলেপ লাগানো যাবে না; সাপে কাটলে ওঝার কাছে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না; যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যেতে হবে; আতঙ্কিত না হয়ে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে অ্যান্টিভেনম নিতে হবে।
আদিকাল থেকেই বাংলাদেশে পদ্মাবিধৌত অঞ্চলগুলোর ঘাসবন সমৃদ্ধ চরাঞ্চলে রাসেলস ভাইপারের উপস্থিতি ছিল। ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশের অন্তত ১৭টি জেলায় রাসেলস ভাইপারের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চল, গড়াই এবং পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলে এর অবস্থান বেশি ছিল। এছাড়া সে সময় রাজশাহী, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ এবং টাঙ্গাইলে রাসেলস ভাইপার সাপের উপস্থিতি দেখা যায়।
তবে সম্প্রতি তথ্যানুযায়ী, দিনাজপুর, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা, পটুয়াখালী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শরীয়তপুর, ঝিনাইদহ, রংপুর, নওগাঁ, মাদারীপুর, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় রাসেলস ভাইপার সাপের উপস্থিত দেখা গেছে।
রাসেলস ভাইপারের মুখোমুখি হলে সাপই আপনাকে সতর্ক করবে। অধিকাংশ সময়ই প্রেশার কুকারের মতো খুব জোরে ‘হিস হিস’ শব্দ করে। এভাবে সে তার নিজের অবস্থান জানান দেয়। এমন অবস্থায় নিরাপদ দূরত্ব বজার রেখে সেই স্থান ত্যাগ করলে সংঘাতের কোনো সম্ভাবনা নেই।
চিকিৎসক এবং প্রাণিবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে দেশে প্রচলিত অ্যান্টিভেনমের মাধ্যমেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ করা সম্ভব। তবে সতর্কতার বিকল্প নেই। তাই এ বিষয়ে দেশের সব অঞ্চলে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও অ্যান্টিভেনম টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
রাসেলস ভাইপার সাপটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪ ফুট লম্বা হতে পারে। এর দেহের রং সাধারণত বাদামি বা ধূসর, যার উপর হলুদ ও কালো ছোপ থাকে। প্রধানত এই সাপ রাতে সক্রিয় হয়। রাসেলস ভাইপার সাধারণত খোলা জায়গা ক্ষেত, ঝোপঝাড় এবং গ্রামীণ এলাকায় বাস করে।
সাধারণত বিরক্তবোধ না করলে কিংবা আত্মরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে এমনটি মনে না করলে রাসেলস ভাইপার অনেকটা শান্তই থাকে। বিপদ আঁচ করতে পারলে এটি কুণ্ডলী পাকিয়ে অবস্থান নেয় এবং সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে।
রাসেল ভাইপারের বিষ অত্যন্ত বিষাক্ত এবং এটি মানুষের শরীরে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এই সাপের বিষের উপাদান ‘এনজাইম’ টিস্যুর মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার নিশ্চিত করে। আরেক উপাদান ‘ফসফোলিপেজ’ সেল মেমব্রেন ধ্বংস করে এবং হেমোলাইসিস সৃষ্টি করে, যা রক্ত কোষের ক্ষতি করে। অন্য উপাদান ‘প্রোটিনেজ’ দেহের প্রোটিন ভেঙে ফেলে, যা টিস্যু ধ্বংস এবং রক্ত জমাট বাধার ক্ষমতা হ্রাস করে।
এছাড়াও রাসেলস ভাইপার সাপের বিষে থাকে ‘হেমোটক্সিন’, যা রক্তের জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। এটি রক্তজমাট বাঁধার ক্ষমতা নষ্ট করে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তপাত সৃষ্টি করে। বিষে থাকা কিছু উপাদান কিডনিরও ক্ষতি করে।
রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে সচেতনতার চেয়ে আতঙ্ক বেশি ছড়ানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করে প্রাণিবিদ আবু সাইদ বলেন, সাপ নাম শুনলে ভয় পায় না এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অথচ সাপ হচ্ছে একটি নিরীহ প্রাণী। তাকে উত্যক্ত না করলে সে সহসা কারো ক্ষতি করে না।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, রাসেলস ভাইপার নিয়ে আমি জনগণকে বলব, আপনারা আতঙ্কিত হবেন না। রাসেলস ভাইপারের যে অ্যান্টিভেনম সেটা আমাদের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত আছে। আমি পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছি কোনো অবস্থাতেই অ্যান্টিভেনমের ঘাটতি থাকা যাবে না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সর্প দংশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রোগীকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া। অনতিবিলম্বে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে এক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলা সম্ভব।







































