
নিম্নমানের কর আদায়, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের গভীর সংকট—এই তিনটি বড় চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুঁজি ঘাটতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা। এমন এক প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার কারণে দলীয় ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে তিনি সুপরিচিত। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং আর্থিক খাত সংস্কারে নতুন দিকনির্দেশনা আসবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দায়িত্ব গ্রহণকে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, শপথের পরপরই তার সামনে যে হিসাবের খাতাটি খোলা আছে, সেখানে প্রথম সংখ্যাটিই বড়—২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি সরকারি ঋণ। নতুন সরকারের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হচ্ছে এই ভারী দায় কাঁধে নিয়েই।
এদিকে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য কয়েক পৃষ্ঠার একটি ‘উত্তরাধিকার নোট’ রেখে গেছেন বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
ঋণের পাহাড় নিয়ে শুরু
সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) সরকার নতুন করে নিয়েছে আরও ৭৪ হাজার কোটির বেশি ঋণ। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।
শুধু ব্যাংকিং খাত থেকেই গত এক বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৫ সালে ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ—যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে যেখানে সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল সাড়ে ২০ শতাংশের কাছাকাছি, বাস্তবে তা প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছায়।
বেসরকারি খাতে স্থবিরতা
সরকারের বাড়তি ঋণগ্রহণের বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আশানুরূপ বাড়েনি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশে, যা লক্ষ্যমাত্রার নিচে। উচ্চ সুদহার, নীতি সুদ ১০ শতাংশে স্থির থাকা এবং ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশে ওঠে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে উদ্যোক্তাদের।
অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট’—যখন সরকার বেশি ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের জোগান সংকুচিত হয়। বর্তমানে অর্থনীতিতে সেই চাপ স্পষ্ট। বিনিয়োগ স্থবির, নতুন শিল্পায়ন ধীর, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কেন বাড়ছে সরকারের ঋণ?
বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আহরণ লক্ষ্য অনুযায়ী না বাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়া পরিশোধ, সঞ্চয়পত্রের দায় এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি—এসব কারণেই সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বেড়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণই প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।
একইসঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেল এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে অর্থনীতিবিদদের।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রত্যাশিত নেতৃত্ব নির্বাচন করেছেন। আমরা নবনির্বাচিত সরকারকে অভিনন্দন জানাই। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এখন সময়ের দাবি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জ্বালানি ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ সুদের হার, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ঋণপ্রাপ্তিতে জটিলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বেসরকারি খাতের আস্থাকে দুর্বল করছে। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর সংস্কার এবং রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখন অত্যন্ত জরুরি।”
তাসকীন আহমেদ বলেন, “জাতীয় স্বার্থে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্বের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী অর্থনৈতিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আমরা আশা করি, নতুন সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।”
নতুন সরকারের প্রতি উচ্চ প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলেছে, দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। সংগঠনটির মতে, নতুন সরকারের নেতৃত্বে একটি স্থিতিশীল, উদ্ভাবনমুখী ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠবে—যা শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করবে এবং দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দৃঢ় করবে।
বিজিএমইএ আশা করছে, ব্যবসাবান্ধব নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রফতানিমুখী সহায়তা জোরদার হলে সামগ্রিক অর্থনীতি যেমন গতি পাবে, তেমনই তৈরি পোশাক খাতও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। সংগঠনটির মতে, নীতি-ধারাবাহিকতা ও উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসা সহজীকরণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া বিনিয়োগে গতি ফেরানো কঠিন হবে। উচ্চ সুদহার ও নীতিগত অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। তাদের অভিমত, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হবে—রাজস্ব সংস্কার, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। না হলে ঋণের ভার বাড়তে থাকবে, কিন্তু প্রবৃদ্ধির গতি ফিরবে না।
এদিকে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ রেখে গেছেন কয়েক পৃষ্ঠার একটি ‘উত্তরাধিকার নোট’, যেখানে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি ও নীতি-অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের তৈরি ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাত সংস্কারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন কাজ শুরুর চেয়ে চলমান সংস্কার জোরদার করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
মূল্যস্ফীতির চাপে প্রবৃদ্ধি ও আয়ের ক্ষয়
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা শ্লথগতি এসেছে। ফলে প্রবৃদ্ধির গতি কমছে, একই সঙ্গে কমছে মানুষের প্রকৃত আয়। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সরবরাহ ও আমদানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জোরদার না হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ টেকসই হবে না।
তবে আশাবাদও রয়েছে। সরকারের কৃচ্ছসাধন ও মুদ্রানীতির প্রভাবের ফলে আগামী জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কাছাকাছি নামতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে বলেও নোটে উল্লেখ রয়েছে।
রাজস্ব খাতে দুর্বলতা, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা
অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা রাজস্ব আদায়ে নিম্নমানের প্রবৃদ্ধি। কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ঋণের সুদ পরিশোধ এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চলমান সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন, কর অব্যাহতি পর্যালোচনা, আয়কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, কাস্টমস আধুনিকায়ন এবং ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস চালুর ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে গভীর সংকট
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিপুল অঙ্কের অর্থ অপচয় হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে পুঁজি ঘাটতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা।
গত সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদহার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ০.৫৮ ও ০.৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে গেলেও অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ভাটা পড়েছে। গত নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ৬.৫৮ শতাংশ কমেছে।
সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে। এর মধ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইন (সংশোধন), ফিন্যান্স কোম্পানি আইন, সিকিউরড ট্রানজেকশন আইন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থঋণ আদালত আইন (সংশোধন), আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ উল্লেখযোগ্য।
ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যর্থ ব্যাংকের পুনর্গঠনে ‘ব্যাংক রিসলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ কার্যকর করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি ব্যাংক রিসলিউশন ইউনিট গঠন করা হয়েছে, যাতে দ্রুত হস্তক্ষেপ সম্ভব হয়। ইতোমধ্যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিতে হচ্ছে—যা বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বৈদেশিক খাতে মিশ্র চিত্র
বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু রফতানির প্রবৃদ্ধি মন্থর। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে প্রত্যাশিত উৎপাদন না হওয়ায় মোট রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা হ্রাস ও প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার কী?
উত্তরাধিকার নোটে কয়েকটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা হয়েছে—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে
বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। কারণ, এই সপ্তাহেই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এছাড়া রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণ। সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা। ব্যাংক খাতে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করা।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে বিএনপির ঘোষিত উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতি, রাজস্ব সংস্কার ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন হবে মুখ্য ভিত্তি।
ইশতেহার অনুযায়ী, করের হার না বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হবে অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে উৎপাদনমুখী প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইসিটি খাতে এক মিলিয়ন চাকরি তৈরির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা থাকবে।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের জন্য ‘ফারমার্স কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে বাড়তি বাজেট বরাদ্দ ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। এছাড়া অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং সবুজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণাও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। ফলে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য প্রথম কাজ হবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।
সামনে যে চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আস্থা পুনরুদ্ধার। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখা, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়িয়ে ঋণনির্ভরতা কমানো এবং ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই দ্রুত ও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এখন আর খণ্ডিত উদ্যোগে কাজ হবে না। সমন্বিত ও ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফেরাতে হবে। অন্যথায়, খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির ত্রিমুখী চাপ দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।































