
রাজধানীর যানজট নিরসনে আগামী ছয় মাসের মধ্যে আরও ৫০টি আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসাবে সরকার। এর মধ্যে ১৫টির কাজ চলমান। নতুন করে আরও ৩৫টি পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রস্তুতকৃত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুই সিটি করপোরেশন ও ডিএমপিকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগে গত ৩০ মার্চ এ সংক্রান্ত এক সমন্বয় সভার আয়োজন করা হয়। বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সাতটি মোড়ে ইতোমধ্যেই আধুনিক এই সিগন্যাল বাতি চালু রয়েছে। আগামী ছয় মাসে আরও ৫০টি বসানো সম্পন্ন হলে এ সুবিধা আরও দৃশ্যমান হবে। পরে গুরুত্বপূর্ণ ১২০টি ক্রসিংয়ের সবগুলোতে ধাপে ধাপে এ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
বুয়েট ও দুই সিটি করপোরেশনের প্রথম ধাপের চুক্তির আওতায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২টি আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপনের কথা ছিল। এর মধ্যে সাতটির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ১৫টির কাজও প্রায় শেষদিকে। আগামী ছয় মাসে যে ৫০টি আধুনিক সিগন্যাল বাতি স্থাপনের কথা রয়েছে তার মধ্যে এই ১৫টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যেসব স্থানে চালু আছে
জাহাঙ্গীর গেট, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে, বিজয় সরণি, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কাওরান বাজার ও ফার্মগেটে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি সচল রয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালুর অপেক্ষায় থাকা ১৫টির মধ্যে ১০টি বসছে শিক্ষা ভবন মোড়, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন মোড়, শাহবাগ, কাকরাইল মসজিদ মোড়, মিন্টো রোড মোড়, মহাখালী, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর এবং আবদুল্লাহপুর এলাকায়। বাকি পাঁচটির অবস্থান জানা যায়নি।
নতুন ৩৫ পয়েন্ট
আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপনের জন্য নতুন করে আরও ৩৫টি পয়েন্ট প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১৭টি ও দক্ষিণে ১৮টি বসানো হবে। এই পয়েন্টগুলোতে কাজ দ্রুত করার লক্ষ্যে বুয়েটকে নকশা প্রণয়ন এবং সিটি করপোরেশনগুলোকে সিভিল ও ইলেকট্রিক কাজ শেষ করার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকারপ্রধানের নির্দেশনায় নগরীতে আরও ৩৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনে তিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় সভা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। কোথায় সিগন্যাল স্থাপন করা হবে, অর্থায়ন কীভাবে হবে এগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে দ্রুত অবকাঠামোর কাজ শেষ হবে।’
দক্ষিণ সিটির ১৮টি পয়েন্টের মধ্যে আছে আজিমপুর, নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, মিরপুর রোডের ধানমন্ডি-৬, ধানমন্ডি-৭, কলাবাগান, পান্থপথ, ধানমন্ডি-২৭, কাঁটাবন, বিজয়নগর (নাইটিঙ্গেল মোড়), ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা, বঙ্গভবন, গুলিস্তান স্কয়ার, জিপিও জিরো পয়েন্ট, তোপখানা (পল্টন মোড়)।
উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৭টি পয়েন্টের মধ্যে আছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদ গেট, গণভবন এলাকা, থানা ক্রসিং, কলেজ গেট, লেক রোড, আগারগাঁও, বিআইসিসি ক্রসিং, টেকনিক্যাল মোড়, মাজার রোড, মিরপুর-১, মিরপুর থানা এলাকা, সনি হলের সামনে, মিরপুর-১০ এবং মিরপুর-১৪।
স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
নতুন এই ব্যবস্থায় থাকবে ‘প্রগ্রেসিভ সিগন্যাল পদ্ধতি’ ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। যেসব স্থানে ইতোমধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেখানে দ্রুত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। নতুন সিগন্যালগুলোতে ক্যাবলিং করার সময় সিসি ক্যামেরার জন্য অতিরিক্ত একটি ক্যাবল লাইন রাখার ব্যবস্থা রাখা হবে। জনদুর্ভোগ কমাতে সিগন্যাল স্থাপনের কাজ হবে মূলত রাতে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ট্রাফিক সিগন্যালিং নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সিস্টেমে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সবগুলো সিগন্যাল লাইটে প্রগ্রেসিভ পদ্ধতিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। দুই সিটি করপোরেশনের লজিস্টিক সাপোর্টে দ্রুত সিগন্যাল স্থাপনের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’
দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মাণ
বুয়েটের তথ্য অনুযায়ী, সংকেত বাতি ও কন্ট্রোলার (নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) সবই স্থানীয় বাজার থেকে পাওয়া উপকরণ দিয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে। এটি মূলত সেমি অটোমেটেড সিগন্যাল এইড। একটি বোতামের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে ম্যানুয়াল কিংবা স্বয়ংক্রিয়, দুই মোডেই সেট করা যাবে। কম যানবাহন থাকলে নির্ধারিত সময়ের জন্য স্বয়ংক্রিয় মোডে চলবে। গাড়ির চাপ বেশি হলে ম্যানুয়ালি সময় পরিবর্তন করে নেওয়া যাবে।
শুরুতে এ ব্যবস্থা সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ সংকেত বাতি (লাল, সবুজ ও হলুদ) জ্বলা-নেভার বিষয় সনাতন পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পরে ধাপে ধাপে এ পদ্ধতি স্বয়ংক্রিয় করা হবে।
পুলিশকে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে না
এই ব্যবস্থা চালু হলে পুলিশকে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত দেখাতে হবে না। সিগন্যালের মাধ্যমে ট্রাফিক বাতি দেখানো হবে। পুলিশ চাইলে যে কোনো সময় যে কোনো সিগন্যালের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এতে কিছু সতর্কতার ব্যবস্থা থাকবে। যেমন, কোনো সিগন্যালে বেশি সময় লাগলে সেটিও জানা যাবে। পথচারী পারাপারের জন্য আলাদা সিগন্যাল থাকবে। এটি যে কোনো সময় আপডেট করা যাবে।
ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি কমিটি গঠন করেছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে এই কমিটিতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাতকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
































