
মো. মুরাদ মৃধা, রাণীনগর,মাঠে সোনালী ধানের হাসিতে যে বুক ভরেছিল কৃষকের, বাজারের তিক্ত বাস্তবতায় সেই হাসিতে এখন বিষাদের ছায়া। উত্তরের অন্যতম শস্যভাণ্ডার নওগাঁর রাণীনগরে ইরি-বোরো ধান কাটা-মাড়াই শুরু হতেই বাজারে লেগেছে ধানের দামের মড়ক। সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি ধানের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত কমে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দেওয়া কৃষকরা।উপজেলার সর্ববৃহৎ ধানের হাট আবাদপুকুর ঘুরে দেখা গেছে এক হাহাকার চিত্র। সপ্তাহখানেক আগেও যে ধান চড়া দামে বিক্রি হয়েছে, এখন তা নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।জিরা শাইল বর্তমানে বাজার দর মন প্রতি ৮৫০ — ১০৫০ টাকা এবং আগে দর ছিল ১৩০০ — ১৪০০ উপজেলার হতাশাগ্রস্ত কৃষকেরা জানায় সার ও কীটনাশক আর শ্রমিকের আকাশচুম্বী দাম দিয়ে ধান ফলিয়েছি। এখন যে দামে বিক্রি করতে হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচই উঠবে না। আমরা যাব কোথায়?আড়তদার ও মিল মালিকরা এই ধসের পেছনে তিনটি ‘মরণফাঁদ’কে দায়ী করছেন ঝড়-বৃষ্টিতে ধান জমিতে নুয়ে পড়ায় কৃষকরা ভেজা ধান বাজারে আনছেন। ভেজা ধান সংরক্ষণ করা কঠিন হওয়ায় ক্রেতারা বিমুখ। লোডশেডিংয়ের কারণে চাতাল ও মিলে ধান শুকানো এবং চাল উৎপাদন থমকে গেছে। ফলে আড়তদাররা ধান কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। সরকারিভাবে ধান কেনা এখনো শুরু না হওয়ায় খোলা বাজারে সিন্ডিকেট ও অনিশ্চয়তা ভর করেছে বলে জানান তারা।এদিকে শিয়ালা গ্রামের কৃষক নাঈম ইসলাম ৬ বিঘা জমিতে বিঘাপ্রতি ২৪ মণ ফলন পেয়েও খুশি হতে পারছেন না। বৃষ্টির কারণে ধানের রং নষ্ট হওয়ায় তাকে পানির দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ৪৩ বিঘা জমিতে আবাদ করা কামাল হোসেনের কপালে চিন্তার ভাঁজ; বিশাল অংকের লোকসানের শঙ্কায় তিনি এখন দিশেহারা।আবাদপুকুর বাজারের মেসার্স শাহজান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ও আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহাজান আলী জানান, "মহাজনরা ভেজা ধান নিতে চাচ্ছেন না। তবে আশা করছি ১৫-২০ দিনের মধ্যে বাজার স্থিতিশীল হবে। ফ্রেন্ডস ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোঃ বজলুর রহমান (বুলু) জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চাল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মহাজনরা আগের তুলনায় অর্ধেক ধান কিনছেন।উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ওবাইদুর রহমান বলেন চলতি মৌসুমে ১৯,৫০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ৩৬ টাকা কেজি দরে ১,৯৬৯ মেট্রিক টন ধান কেনা হবে। তবে চাল সংগ্রহের চূড়ান্ত নির্দেশনা এখনো আসেনি।রাণীনগর কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুন বলেন বিঘা প্রতি ২৬-৩০ মণ পর্যন্ত ফলন হয়েছে যা রেকর্ড। তবে ১১ মে পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়া থাকতে পারে, তাই কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।বাম্পার ফলনের আনন্দ এখন রাণীনগরের কৃষকদের কাছে নিরানন্দে পরিণত হয়েছে। একদিকে প্রকৃতির তাণ্ডব, অন্যদিকে বাজারের অস্থিরতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট কৃষক এখন শুধু সরকারি হস্তক্ষেপের অপেক্ষায়।





























