
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ সিলেট। প্রাচীনকালে শ্রীহট্ট নামে পরিচিত এই অঞ্চল আজও বহন করছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্মৃতি।
পাহাড়, নদী, হাওর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সিলেটের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল মুজাররদ ইয়েমেনি (রহ.)-এর নাম।
রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন, শেখ বুরহানউদ্দিনের ওপর নির্যাতনের প্রচলিত ঐতিহাসিক কাহিনি এবং হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমন—সব মিলিয়ে সিলেটের ইতিহাস এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক।
রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন ও শেখ বুরহানউদ্দিনের ঘটনা
প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন শ্রীহট্টের শাসক ছিলেন রাজা গৌড়গোবিন্দ। তাঁর শাসনামলে শেখ বুরহানউদ্দিন নামের এক মুসলিম ব্যক্তি সন্তানের আকিকা উপলক্ষে গরু জবাই করেন।
কথিত আছে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজদরবারে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে রাজা গৌড়গোবিন্দের নির্দেশে তাঁর নবজাতক সন্তানকে হত্যা এবং তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
এ ঘটনার পর শেখ বুরহানউদ্দিন ন্যায়বিচারের আশায় বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের কাছে যান বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে শ্রীহট্টে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। ইতিহাসের প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে সিকান্দার খান গাজীর নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর সফরসঙ্গী আউলিয়ারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কথিত আছে, তিনি ৩৬০ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সিলেটে আগমন করেন। তাঁর ভাগনে হযরত শাহপরান (রহ.)-এর নামও এ অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
তবে ঐতিহাসিক গবেষণায় সিলেট বিজয়ের সামরিক নেতৃত্ব ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। ১৫১২-১৩ সালের একটি শিলালিপিতে সিকান্দার খান গাজীকে সিলেট বিজয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক অবদান এবং সামরিক অভিযানের নেতৃত্বের বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শাহজালাল (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক অবদান
সিলেটে অবস্থানকালে হযরত শাহজালাল (রহ.) ধর্মীয় শিক্ষা, মানবসেবা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। তাঁর অনুসারী ও সফরসঙ্গীদের মাধ্যমে সিলেটসহ আশপাশের অঞ্চলে তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৫ খ্রিষ্টাব্দে সিলেটে এসে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে। এটি শাহজালাল (রহ.)-এর জীবন ও খ্যাতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র।
তাঁর ইন্তেকালের সুনির্দিষ্ট সাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে মতভেদ রয়েছে। সিলেট জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্যে ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ইবনে বতুতার সাক্ষাতের বিবরণে ১৩৪৫ সালের কথা পাওয়া যায়। তাই এ সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
দরগাহ শরিফের ঐতিহ্য ও দর্শনীয় নিদর্শন
সিলেট নগরীর দরগাহ মহল্লায় অবস্থিত হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পবিত্র মাজার। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত, দর্শনার্থী, পর্যটক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে আসেন।
দরগাহের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলী। ভেতরে রয়েছে বিশাল মসজিদ, মুসল্লিদের অজুর ব্যবস্থা এবং কয়েকটি বড় খেজুরগাছ। এসব গাছের নিচে দরবেশ, ফকির ও ভক্তদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
খেজুরগাছের পাশে মোয়াজ্জেম বাড়িতে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে পরিচিত একটি তলোয়ার ও এক জোড়া সোনালি খড়ম সংরক্ষিত রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ রয়েছে।
প্রধান ফটকের পাশে রয়েছে দরগাহ অফিস, বিখ্যাত জালালী কবুতরের বিচরণস্থল, নারীদের নামাজের স্থান এবং শিন্নি রান্নার জন্য ব্যবহৃত বড় বড় ডেগ। এ ছাড়া রয়েছে লঙ্গরখানা, যেখানে মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। দরগাহের সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
পুকুর, গজার মাছ ও ঐতিহাসিক কূপ
দরগাহ প্রাঙ্গণের ভেতরে রয়েছে একটি ঐতিহ্যবাহী পুকুর। সেখানে বড় আকারের গজার মাছ ও কচ্ছপের বিচরণ দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। অনেক দর্শনার্থী পুকুরের মাছ ও কচ্ছপ দেখতে ভিড় করেন।
পুকুরের পাশেই রয়েছে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত বলে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক কূপ। এর কাছাকাছি রয়েছে মজু শাহের মাজার এবং একটি বিশাল কবরস্থান। এসব স্থাপনা দরগাহ প্রাঙ্গণের ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
মূল মাজারের অভ্যন্তরে ঐতিহাসিক সমাধি
মূল মাজারে প্রবেশের পথে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সিঁড়ি, নামাজের স্থান, খাদেমদের ইবাদতখানা এবং দানবাক্স। মাজারের অভ্যন্তরে কয়েকটি ঐতিহাসিক সমাধি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত পরিচিতি অনুযায়ী, সেখানে হযরত শেখ হাজী মোহাম্মদ ইউসুফ, হাজী পীর দরিয়া, হযরত হাজী খলিল এবং আবু তোরাব আব্দুল ওয়াহাবের সমাধি রয়েছে।
এরপরই রয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মূল সমাধি।
লাল-সবুজের সাতটি সামিয়ানার নিচে তাঁর সমাধি অবস্থিত বলে দরগাহে প্রচলিত রয়েছে।
মাজারের ডান পাশে ইয়েমেনের শাহজাদা শেখ আলী এবং বাম পাশে সিলেটের শাসনকর্তা হিসেবে পরিচিত মকবুল খানের সমাধি রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। অভ্যন্তরে পবিত্র কোরআন শরিফ, নামাজের স্থান ও দানবাক্স রয়েছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত নিদর্শন
সব মিলিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
প্রাচীন শ্রীহট্টের ইতিহাস, রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন, শেখ বুরহানউদ্দিনের ঘটনা এবং হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমন—সবকিছুই সিলেটের ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তবে এত সমৃদ্ধ ঐতি
প্রাচীন শ্রীহট্টের ইতিহাস, রাজা গৌড়গোবিন্দের শাসন, শেখ বুরহানউদ্দিনের ঘটনা এবং হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমন—সবকিছুই সিলেটের ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তবে এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অধিকারী এই স্থানের ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ শরিফ যুগ যুগ ধরে সিলেটের আধ্যাত্মিক পরিচয় ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
সরেজমিনে দেখা দৃশ্য, স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য এবং ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে এই প্রতিবেদন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। তথ্যগত কোনো অসংগতি থাকলে সংশ্লিষ্টদের সঠিক তথ্য ও পরামর্শ সাদরে গ্রহণ করা হবে।
প্রতিবেদক: শাহিন মিয়া
বিশেষ প্রতিনিধি
সভাপতি, অষ্টগ্রাম রিপোর্টার্স ক্লাব




























