
তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র সরাসরি অভিযোগ উঠেছে।। নতুন করে ইসরায়েলের আগ্রাসী অবস্থান পুরো দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। সেই জটিলতা কাটানোর একমাত্র পথ ‘ইসলামাবাদ টকস’, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধুম্রজাল।
ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠক সোমবার (২০ এপ্রিল) হওয়ার কথা থাকলেও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের ফোনালাপ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তেহরান এই মুহূর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরতে আগ্রহী নয়।
ইরান মনে করছে, আলোচনার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র সময় ক্ষেপণ করছে এবং ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য নতুন লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকির পর তেহরানের কট্টরপন্থীরা আলোচনার টেবিল ত্যাগ করার জন্য সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।
যদি এই আলোচনার পথ চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে আগামী ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরণের নৌ-সংঘাত শুরু হতে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামাবে। কিন্তু এর চেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে মার্কিন মিত্র ইসরায়েল।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মার্কিন মিত্র ইসরায়েলের সাম্প্রতিক রণকৌশল। ইসরায়েল এখন কেবল ইরান বা লেবাননের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, দেশটি এখন ন্যাটো সদস্য তুরস্ককে নিজেদের শত্রু হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার শত্রু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইসরায়েলের দাবি, তুরস্ক পর্দার আড়াল থেকে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করছে। এমতাবস্থায় ইসলামাবাদ টকস পুরোপুরি ব্যর্থ হলে মার্কিন লবির বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষে সরাসরি দাঁড়াতে পারে তুরস্ক।
অন্যদিকে আলোচনার আয়োজক দেশ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রতি ইসরায়েল ক্ষুব্ধ। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অভিযোগ, পাকিস্তান তাদের পারমাণবিক প্রযুক্তি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরানকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
যদিও পাকিস্তান তা অস্বীকার করেছে। চীন ও আমেরিকার মতো চিরশত্রু দুই দেশের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষায় পারদর্শী পাকিস্তানের পক্ষে এমনটা করাকে অসম্ভবও মনে করছেন না অনেকে।
যদি ইসরায়েল তুরস্ক বা পাকিস্তানে কোনো ধরণের ‘স্ট্রাইক’ বা আগাম হামলা চালায়, তবে এটি আর আঞ্চলিক সংঘাত থাকবে না। তুরস্ক ন্যাটো সদস্য হওয়ায় পুরো ইউরোপ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে। এই যুদ্ধে শক্তি দেখাতে পারে চীনও। এখন প্রশ্ন হচ্ছে চীন কিভাবে জড়াবে সেখানে?
পর্দার আড়ালে থাকা চীন কি হাল ছাড়বে?
ইসলামাবাদ টকসের নেপথ্যে আসল কারিগর ছিল চীন। বেইজিংয়ের ‘ফাইভ-পয়েন্ট পিস প্ল্যান’-এর ভিত্তিতেই তেহরান শুরুতে আলোচনায় রাজি হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র যদি নমনীয় না হয়ে টেবিল ত্যাগ করে, তবে চীন সম্ভবত ইরানের ওপর সরাসরি নিরাপত্তা গ্যারান্টি ঘোষণা করতে পারে। চীন ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যদি ওয়াশিংটন একতরফা হামলা চালায়, তবে বেইজিং মার্কিন ডলারের বিপরীতে বড় ধরণের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেবে এবং ইরানের তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজস্ব নৌবাহিনী মোতায়েন করবে।
ইসলামাবাদ টকস ব্যর্থ হওয়ার অর্থ হলো কূটনীতির পরাজয় এবং অস্ত্রের শক্তির উত্থান। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনমনীয়তা, অন্যদিকে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের অনাস্থা—সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন ১৯৩৯ সালের পরবর্তী সবচেয়ে বড় সামরিক সংকটের মুখোমুখি।
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা নির্ধারণ করবে বিশ্ব কি শান্তির পথে ফিরবে, নাকি একটি নিয়ন্ত্রণহীন ‘গ্লোবাল কনফ্লিক্ট’-এ নিমজ্জিত হবে। তবে আশা খবর হচ্ছে আলোচনায় বসতে আগামীকাল ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সময় আছে ইরানের হাতে।







































