
আরাফাত আলী, স্টাফ রিপোর্টার:
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের মানপুর গ্রামে দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত চলাচলের রাস্তায় বাঁশ ও নেটের বেড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। এতে কয়েকটি পরিবারের স্বাভাবিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ও আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরও কার্যকর সমাধান মিলছে না। এমনকি আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পরও কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত ওই পথে সম্প্রতি বাঁশ ও নেটের বেড়া দেওয়া হয়। এতে বাড়ি থেকে ইঞ্জিনভ্যান ও মোটরভ্যান বের করা, খামারে বালি ও অন্যান্য মালামাল নেওয়া এবং দৈনন্দিন যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম বলেন, রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার দুটি খামার প্রায় আড়াই মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে। খামারে প্রয়োজনীয় বালি ও অন্যান্য মালামাল নেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ইঞ্জিনভ্যান ও মোটরভ্যানও বাড়িতে নিতে পারছেন না। এতে তার ব্যবসা ও খামারের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রথমে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পি-১১৩৯/২৬ নম্বর মামলা করেন। তার দাবি, আদালত শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিলেও সেটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
আরেক ভুক্তভোগী আরিফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও থানায় একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। পরে পুলিশ সুপারের কাছেও বিষয়টি জানানো হয়। তার অভিযোগ, কালিগঞ্জ থানার ওসি বারবার ‘দেখছি’ বলে সময়ক্ষেপণ করছেন। এতে সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
ভুক্তভোগী মনিরা বেগম বলেন, প্রথমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা হয়। পরে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলে বেড়া সরিয়ে চলাচলের পথ উন্মুক্ত করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। কিন্তু সেই নোটিশও উপেক্ষা করা হয়েছে। তার অভিযোগ, প্রায় দুই মাস ধরে থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি।
নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, তার দুটি খামার ও দুটি ভ্যান রয়েছে। রাস্তা বন্ধ থাকায় খামারে নিয়মিত যাতায়াত করতে পারছেন না। আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ১৫ দিন ধরে থানায় যোগাযোগ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুবুর রহমান বলেন, তার জানামতে ওই স্থানে আগে কোনো বেড়া ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি স্থানীয়দের চলাচলের রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আশপাশের বাসিন্দাদের পাশাপাশি বর্তমানে যে পরিবারের পক্ষ থেকে বেড়া দেওয়া হয়েছে, তাদের সদস্যরাও অতীতে এই পথ দিয়ে চলাচল করতেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিপক্ষ আমিরুল ইসলাম ও নাজমুল হুদা বলেন, জায়গাটি তাদের পারিবারিক কবরস্থানের অংশ। তারা ওই জমির অংশীদার এবং জমি নিয়ে আদালতে দেওয়ানি মামলা চলমান রয়েছে। কবরস্থানের নিরাপত্তার জন্যই বেড়া দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।
তাদের আরও দাবি, সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সামান্য জায়গা রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের জমি সংক্রান্ত দাবিও তারা অস্বীকার করেন। তাদের ভাষ্য, জমির মালিকানা ও সীমানা নিয়ে বিরোধ আদালতে বিচারাধীন থাকায় বিষয়টি আইনগতভাবেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
সমাধানের উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার অভিযোগ
কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জামাল ফারুক মন্টু বলেন, বিষয়টির পেছনে মূলত পারিবারিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। তার বয়স প্রায় ৩৬ বছর এবং জন্মের পর থেকেই তিনি ওই পথ দিয়ে চলাচল করে আসছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পথটি শুধু চলাচলের জন্য নয়, পানি নিষ্কাশনের পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
তিনি বলেন, বেড়া দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে মাপজরিপের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আলোচনার জন্য দিন-তারিখও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত বৈঠকের আগেই এক পক্ষ আর আলোচনায় বসবে না বলে জানিয়ে দেয়। পরে তিনি বিষয়টি নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো আদালতের নির্দেশনার পরও চলাচলের পথ নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া। তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা হাতে নিয়ে থানায় যোগাযোগ করা হলেও পুলিশ বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তারা ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন।
এ বিষয়ে কালিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহিনুর রহমান আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করার অভিযোগের বিষয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন,আমরা বিষয়টি দেখছি।
এ বিষয়ে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. বায়েজীদ ইসলাম বলেন, “আমি খোঁজখবর নিয়ে দেখি, আর কী কী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত পথ নিয়ে বিরোধ, আদালতের নির্দেশনা এবং একাধিক পক্ষের অভিযোগের পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব হয়, তাহলে ভুক্তভোগীদের ভোগান্তির অবসান হবে কবে? তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে চলাচলের পথ উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।




























