
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও এবারের গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এই ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে কৌশলে গ্রামের মানুষের ওপরই লোডশেডিংয়ের পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তীব্র দাবদাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিং। তবে এই ভোগান্তি দেশের সব নাগরিকের জন্য সমান নয়। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও এটি স্পষ্ট যে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় শহর আর গ্রামের মধ্যে এক বিশাল বৈষম্য স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
কাগজে-কলমে ‘শতভাগ বিদ্যুতায়ন’ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি থাকলেও, জ্বালানি সংকট আর ভুল পরিকল্পনার মাশুল দিতে হচ্ছে মূলত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায় থাকা দেশের প্রান্তিক ৩ কোটি ৭৭ লাখ গ্রাহককে। এক কথায়, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোকে কৃত্রিমভাবে ‘লোডশেডিংমুক্ত’ রাখতে গিয়ে গ্রামকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অন্ধকারের অতলে।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও এবারের গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। এই ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে কৌশলে গ্রামের মানুষের ওপরই লোডশেডিংয়ের পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-র তথ্যানুযায়ী, ২০ এপ্রিল সারা দেশে ১ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের কথা বলা হলেও আরইবির অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
একই সময়ে কেবল আরইবির আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতেই লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানে ঘাটতি কম দেখিয়ে এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, যার প্রকৃত শিকার গ্রামের সাধারণ মানুষ।
গত সোমবার রাত ৮টায় আরইবির ১০ হাজার ৪৪৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৪১৪ মেগাওয়াট। ফলস্বরূপ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রামগুলোকে।
রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী দুই সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসি তাদের চাহিদার পুরো অংশই সরবরাহ পাচ্ছে। ফলে ঢাকায় বড় কোনো লোডশেডিংয়ের খবর নেই। অন্যদিকে, নেসকো ও ওজোপাডিকো’র মতো বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক সংস্থাগুলো সামান্য কিছু ঘাটতি পেলেও তা আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু আরইবির ৮০টি সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ পাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সরবরাহ কম পাচ্ছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের মতে, সারা দেশের গ্রামাঞ্চলকে বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত করাটা দীর্ঘদিনের এক দুর্ভাগ্যজনক সংস্কৃতি। তিনি মনে করেন, সমতাভিত্তিক লোডশেডিং নিশ্চিত না করা হলে এই বৈষম্য কেবল সামাজিক ক্ষোভই বাড়াবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে।
বিদ্যুৎ খাতের এই নাজুক অবস্থার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা। পিডিবি প্রধান রেজাউল করিম জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ কমায় ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ১২০ কোটি ঘনফুট হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯০ কোটি।
পিজিসিবির তথ্যমতে, দেশের ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গ্যাস ও তেলের অভাবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৩০টি কেন্দ্র বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ৫২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের বোঝা। ভারতের আদানি গ্রুপ বকেয়া পরিশোধে বারবার তাগাদা দিচ্ছে। সময়মতো বিল না দিলে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা রপ্তানি কমে যাওয়ায় পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী কেন্দ্র থেকে সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না। আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিই আজ পুরো বিদ্যুৎ খাতকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চলতি বোরো মৌসুমে লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের অবস্থা এখন নাজেহাল। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সেচপাম্প মালিক আশরাফ শেখ আক্ষেপ করে বলেন, “২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। ধানের জমিতে পানি দিতে পারছি না, মানুষের গালি শুনতে হচ্ছে।”
একই চিত্র চট্টগ্রামে। লোডশেডিংয়ের কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা রাতে পড়াশোনা করতে পারছে না। গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প ও কলকারখানাগুলোতে উৎপাদন থমকে গেছে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে শহরের চাকচিক্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, যার কোনো সুফল কৃষিপ্রধান গ্রামের প্রান্তিক মানুষ পাচ্ছে না।
চাপে পড়ে পিডিবি চেয়ারম্যান সুষম হারে বিদ্যুৎ বিতরণের নির্দেশনা দেওয়ার কথা বলেছেন। আজ বুধবার সব বিতরণ অঞ্চলে নির্দেশ দেওয়া হবে যে—ঘাটতি শুধু গ্রামের ওপর নয়, সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই আশ্বাস কেবল সাময়িক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই আমদানিনির্ভর বড় বড় কেন্দ্র নির্মাণ এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময় বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার দোহাই—সব মিলিয়ে সংকটটি এখন কাঠামোগত।
রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরগুলোকে কৃত্রিমভাবে আলোকিত রাখার যে ‘রাজনৈতিক নীতি’ গ্রহণ করা হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্তরায়। গ্রামের মানুষও নিয়মিত বিল পরিশোধ করেন এবং তারাও রাষ্ট্রের সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। যদি সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা না যায়, তবে অচিরেই লোডশেডিংয়ের এই বৈষম্য গ্রামীণ অর্থনীতি ও জননিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।

































