
# নিবন্ধন নম্বর ও মেয়াদসহ প্রবেশপথে টানাতে হবে লাইসেন্স# তথ্য কর্মকর্তার ছবি ও নম্বর টানানো বাধ্যতামূলক# নির্দেশনা মানা না হলে কঠোর ব্যবস্থা
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের স্বাস্থ্যখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। চিকিৎসাসেবা দিয়ে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল যেমন সুনাম কুড়িয়েছে বিপরীতে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসাসহ নানা অভিযোগও আছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযানে ছোটবড় সব ধরনের হাসপাতালেই নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযানে ইচ্ছেমতো ফি আদায়, নিবন্ধন না থাকাসহ নানা কারণে অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়গনেস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের অন্তত ১২০০ বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। এ অবস্থায় বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ দফা নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
অফিস আদেশে হাসপাতালের নিবন্ধন ও সেবার পরিধি নিশ্চিতে প্রবেশপথে মেয়াদকালসহ লাইসেন্সের কপি প্রদর্শন, জনসংযোগ কর্মকর্তা নিয়োগ নিশ্চিতসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আর এসব নির্দেশনা না মানা হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।
তবে এটিই প্রথম উদ্যোগ নয়। এর আগেও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নির্দেশনা জারিসহ একাধিকবার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কথা বলেছিলেন। যদিও মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে এবার 'অফিস আদেশ' আকারে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষিতে নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো কতটা উদ্যোগী হবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে নির্দেশনা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কতটা সোচ্চার হবে এবং এটি মানতে প্রতিষ্ঠানগুলো কেন অনিচ্ছুক তা নির্ণয়ে উদ্যোগ নেওয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নির্দেশনা মানছে কী?
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ১০ দফা নির্দেশনার প্রথম দফায় বলা হয়েছে, বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লাইসেন্সের কপি প্রতিষ্ঠানের মূল প্রবেশ পথের সামনে দৃশ্যমান স্থানে স্থায়ীভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে সকল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সরবরাহের জন্য একজন তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ এবং তার ছবি ও মোবাইল নম্বর দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করা।
দশটি নির্দেশনার মধ্যে এই দুটি নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবগত কি না তা দেখতে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে সরজমিন ঘুরেছেন এই প্রতিবেদক।
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে। তবে সরেজমিনে হাসপাতালটির কোনো গেটেই মেয়াদকালসহ লাইসেন্স ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়নি।
একই অবস্থা মগবাজারের রাশমনো পলিক্লিনিক প্রাইভেট লিমিটেডেও। প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশ পথে একাধিক চিকিৎসকের পরিচয়, ডিগ্রিসহ বিভিন্ন তথ্য প্রদর্শন করা হলেও লাইসেন্স নজরে পড়েনি। যদিও প্রতিষ্ঠানটির মূল প্রবেশপথের পাশের দেয়ালে সিটি করপোরেশনের কাগজ লাগানো রয়েছে। এমনকি হাসপাতালের রিসিপশনেও এ সংক্রান্ত কোনো কাগজ প্রদর্শন করা হয়নি।
অপরদিকে ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপালের প্রবেশপথে জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন নির্দেশনা, ময়লা ফেলা সংক্রান্ত সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা থাকলেও লাইসেন্স নজরে পড়েনি। হাসপাতালটির রিসিপশনে হাসপাতালের প্রাপ্ত বিভিন্ন স্বীকৃতি প্রদর্শন করা হয়েছে। তনে লাইসেন্স সংক্রান্ত কোনো কিছু ছিল না।
যা বলছে প্রতিষ্ঠানগুলো?
নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে আদ-দ্বীন হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইকবাল হাসান রুদ্র বলেন, গতকাল বিকেলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা আদেশটি পেয়েছি। তবে আজ শুক্রবার হওয়ায় টানিয়ে দেওয়া হয়নি। দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
রাশমনো পলিক্লিনিকে জনসংযোগ কর্মকর্তা আছে দাবি করা হলেও শুক্রবারের কারণে তিনি আসেননি বলে জানিয়েছেন রিসিপশনের দায়িত্বরতরা। এ বিষয়ে তাদের জানা নেই বলে জানান।
নির্দেশনা বাস্তবায়নে কতটা উদ্যোগী দায়িত্বশীলরা
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লাইসেন্স গ্রহণের তারিখ মেয়াদসহ প্রদর্শন করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে এর বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, আমি মাত্র নির্দেশনা দিয়েছে। আগে নির্দেশনা দেওয়ার পরেও কেন তা বাস্তবায়ন করা হয়নি, তা খতিয়ে দেখতে হবে। আমি এই বিষয়গুলো দেখব। যদি প্রোপার লাইসেন্স থাকে তাহলে কেন তারা প্রদর্শন করবে না? এটা অবশ্যই প্রদর্শন করতে হবে। মাত্র তো নির্দেশনা দিলাম, দু-একদিন পর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এটি খতিয়ে দেখা হবে। আগামী রোববার মন্ত্রণালয়ের আপডেট জানানো হবে।
নির্দেশনা না মানার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, যাদের লাইসেন্স আছে তারা সবাই আমাদের অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত। নতুন যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমরা সকলকে জানিয়েছি। আমরা সবাইকে জানাতে পারি ও এটি করতে বলতে পারি। কে মানলো বা মানলো না তা আমাদের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যে নির্দেশনা দেওয়া হয় তা আমরা সবাইকে পৌঁছে দেই। গতকাল যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাও আমরা সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছি। আশা করি সবাই তা মেনে চলবে।
অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা তো কোনো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ না। আমরা মোটিভেটেড করতে পারি। যাদের লাইসেন্স আছে তারা সবাই এটা প্রদর্শন করে, যাদের নেই তারাই হয়তো করছে না। যাদের আছে তাদের এটা গৌরবের সঙ্গে করা উচিত। আমাদের অ্যাসোসিয়াশনের পক্ষ থেকে সরকারের সকল নির্দেশনা ও নিয়ম বাস্তবায়নে সহায়তা করা হয়।’
ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, যারা মানে না, এটা তাদের দায়। বেসরকারি ক্ষেত্রে ৬০ ভাগ সেবা বেসরকারিক খাত দেয়। আমরা মানুষের আস্থার স্থানটি ধরে রাখতে চাই। যাদের জন্য এ খাত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, যারা দৃষ্টিকটু কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেই আমি মনে করি।







































