
রাজধানীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নৈরাজ্য চলছেই। কোথাও নেই মিটার চালিত ভাড়া সিটেম। সর্বত্রই চুক্তিভিত্তিক ভাড়া পদ্ধতি। আর এতে প্রতিনিয়তই ঠকতে হচ্ছে যাত্রীদের। সিএনজিচালিত অটোরিকশা একসময় মিটারে যাত্রী পরিবহন করত। কিন্তু চালকদের ভাড়া নৈরাজ্যের কারণে মিটারের কথা ভুলেই গেছেন যাত্রীরা। কিছুতেই শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না এ পরিবহন সেবাকে। মিটারে অটোরিকশা চলাচলের নিয়ম থাকলেও কোনো চালকই মিটারে যাত্রী পরিবহন করতে চান না। সিএনজি অটোরিকশার এই ভাড়ানৈরাজ্য চলছে পুরো ঢাকা শহরেই। যাত্রীর ইচ্ছেমতো গন্তব্যে মিটার অনুযায়ী অটোরিকশা চলাচল করবে, এটাই নিয়ম। অথচ রাজধানীতে যাত্রীদের রীতিমতো জিম্মি করে রেখেছেন চালকেরা। তাদের গন্তব্য পছন্দ না হলে যাত্রী তুলছেন না। সড়ক পরিবহন আইনে বলা আছে, অটোরিকশাচালক রুট পারমিট এলাকার ভেতরে যেকোনো গন্তব্যে মিটারে যেতে বাধ্য থাকবেন। মিটারে প্রদর্শিত ভাড়ার অতিরিক্ত দাবি বা আদায় করতে পারবেন না।
জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সিএনজিচালিত অটোরিকশার মিটারের ভাড়া নির্ধারণ করে দিলেও চালকরা মিটারে না গিয়ে ভাড়ার চুক্তিতে বেশি আগ্রহী। তারা মিটারের তুলনায় তিন থেকে চারগুণ ভাড়ায় যেতে বাধ্য করছেন যাত্রীদের। চালকরা বলছেন, বিআরটিএ থেকে ২০১৫ সাল থেকে অটোরিকশার মালিকদের ৯০০ টাকা করে জমা নেয়ার নির্দেশনা ছিল। অর্থাৎ কোনো চালক এ টাকায় দিনচুক্তিতে ভাড়ায় চালাতে পারবেন। কিন্তু মালিকরা ১৩০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত জমা নিচ্ছেন বলে অটোরিকশার চালকরা দাবি করেন।
ঢাকা শহরে ২০০২ সালের শেষ দিক থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল শুরু হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রায় ১৩ হাজার অটোরিকশার নিবন্ধন দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। পরে ২০১৫ সালে তিন চাকার বাহন মিশুক তুলে দিয়ে আরও দুই হাজার অটোরিকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় এখন ভাড়ায়চালিত ১৫ হাজার অনুমোদিত অটোরিকশা রয়েছে। আর ব্যক্তিগত অটোরিকশা আছে ৫ হাজার। সিএনজিচালিত অটোরিকশার বর্তমান ভাড়ার হার ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমান ভাড়া অনুযায়ী অটোরিকশার প্রথম ২ কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১২ টাকা করে। প্রতি এক মিনিট অপেক্ষার (যাত্রাবিরতি, যানজট ও সিগন্যাল) জন্য ২ টাকা। আর মালিকের জমা ৯০০ টাকা।
রাজধানীতে অটোরিকশার বেশ চাহিদা থাকলেও দুই দশকের বেশি সময় ধরে নতুন করে তা অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। ফলে অটোরিকশার মালিকানা বদল নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি চক্র। অটোরিকশাচালক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে একেকটি অটোরিকশার কাগজপত্র পেতে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক নেতা, পুলিশ ও বিআরটিএর কর্মকর্তাদের একটা অংশ এই ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
মতিঝিল থেকে এক যাত্রী ধানমন্ডি যেতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁজছেন। কিন্তু এই দূরত্বের ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ভাড়া চান সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা। দাম দর করে ৩৫০ টাকায় চুক্তি করেন। তিনি বলেন তাই বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ায় হয়তো যেতে হবে।
গুলিস্তান থেকে গুলশানে যাচ্ছিলেন আরেক যাত্রী। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ভাড়া নৈরাজ্য কেউ থামাতে পারছে না। যাত্রীদের জিম্মি করে অটোরিকশার চালকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে। চুক্তিতে গেলেও মিটার চালু করে রাখে। কেউ কেউ বলে রাখেন, ট্রাফিক জিজ্ঞেস করলে বলবেন মিটারে যাচ্ছি। কিন্তু যদি মিটারে যেতে বলা হয়, তাতে রাজি হয় না কোনো চালক। এটা তো এখন প্রকাশ্যে হচ্ছে। সরকারি সংস্থাগুলোর কারও কোনো নজর নেই। যার জন্য দিনের পর দিন এ ভাড়া নৈরাজ্য চলছে সড়কে।
আমজাদ নামে এক চালক বলেন, অটোরিকশার মালিকরা বিআরটিএ নির্ধারিত জমার চেয়ে বেশি নিচ্ছে। এ ছাড়া রাস্তায় থাকার সময় অনেক খরচ থাকে। সেগুলোর জন্য আমরা মিটারে যাত্রী পরিবহন করতে পারি না। আবার অনেক যাত্রীরাও মিটারের বদলে চুক্তি করে যাচ্ছেন। যদি মিটারে চালাই, তাহলে আমাদের পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে। কারণ রাস্তার খরচ, গ্যাস ও জমার টাকা দিয়ে আগের মতো টাকা থাকে না। তাছাড়া এখন মেট্রোরেল চলায় আমাদের আগের মতো আয় নেই। আগে মতিঝিল থেকে মিরপুর অনেক যাত্রী ছিল। সেই যাত্রীরা এখন মেট্রোরেলে চলে যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ সভাপতি মো. হানিফ খোকন বলেন, একজন চালককে সরকারের নির্ধারিত টাকার বেশি ভাড়া জমা দিতে হয় অটোরিকশা মালিকদের। সেটাও কমানো দরকার। আর অনেক বছর আগে মিটারে ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে চালকরাও যেন ভালোভাবে তাদের জীবন চালাতে পারে, সেভাবে মিটারে ভাড়া নির্ধারণ করা দরকার।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে যেসব ভাড়া নির্ধারণ করা হয় সেগুলো যাত্রীবান্ধব হয় না। মালিকবান্ধব ভাড়ায় বেশি চলে। যার জন্য অটোরিকশায় ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হয় যাত্রীদের কাছে। তাই সরকারের উচিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা যেন মিটারে চলে সে বিষয়গুলো কঠোরভাবে মনিটরিং করা।
এদিকে, রাজধানী থেকে আশপাশের নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ চেয়ে সাতটি দাবি জানিয়েছে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদ। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এসব দাবি জানান তারা। সমাবেশে পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, আমরা সিএনজি অটোরিকশাচালকরা দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেও অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি না। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা নেই। আইএলও কনভেনশন ৮৭ অনুযায়ী অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার কার্যত অধিকার নেই। আমরা যা আয় করি, তার সিংহভাগ নিয়ে নেয় সিএনজি অটোরিকশার মালিক, প্রশাসন ও চাঁদাবাজ-দালালরা। খাওয়া-পরার খরচ শেষে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার খরচ চালানো ও মাস শেষে ঘরভাড়া দিতেও হিমশিম খাই। নিজে ও পরিবার-পরিজন অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি না।
তিনি আরও বলেন, আমরা সিএনজি অটোরিকশাচালকরা ঋণের জালে জড়িয়ে আছি। সিএনজি অটোরিকশা পরিচালনায় সরকারি যে নিয়ম-নীতি রয়েছে, তা দুঃশাসনে পরিণত হয়েছে। সিএনজি অটোরিকশা জগতে সুশাসন বলে কিছু নেই। সর্বক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা চলছে। প্রশাসন একে আইনের প্রয়োগ বলে দাবি করছে। আমাদের দাবিগুলো সরকারের বাস্তবায়ন করা উচিত। দাবি আদায় না হলে আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়া আমাদের বিকল্প কোনও পথ খোলা নেই।







































