
গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা: শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলা এবং মুসলিম হওয়ায় এক ভারতীয় নারীকে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে জোরপূর্বক বাংলাদেশের পুশইন করেছে সে দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বৈধ নাগরিকত্বের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এই পুশব্যাকের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি তুলে ঘটনার বিচার ও তাকে দেশে ফেরাতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তার পরিবার ও একটি মানবাধিকার সংগঠন। জানা গেছে, ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম সাইদা ফকির (৫০)। তিনি উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার স্বরূপনগর ব্লকের গোবিন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।তবে স্বামী জুম্মান ফকিরের সঙ্গে গত ২০ বছর ধরে মুম্বাইতে বসবাস ও কাজ করছিলেন। গত ১৯ জুলাই মুম্বাইয়ে বাজার করতে বের হলে তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মুম্বাই পুলিশ আটক করে। এসময় নিজেকে ভারতীয় দাবি করলেও এবং বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তার কথায় কান দেয়নি।সাইদা ফকির বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়ায় ইউনিয়নের ভাদিয়ালি গ্রামের বাসিন্দা আবুল বাশার ও আরিফা দম্পতির বাড়িতে অবস্থান করছেন। ভুক্তভোগী সাইদা ফকির জানান, তিনি গত প্রায় ২০ বছর ধরে পরিবারের সাথে মুম্বাইয়ে বসবাস করে আসছিলেন।চলতি মাসের ১৮ বা ১৯ তারিখ রাতে মুম্বাইয়ের একটি স্থানীয় বাজার থেকে সবজি-রুটি কিনে ফেরার পথে ভারতীয় সিআইডি পরিচয়ে ৪-৫ জনের একটি দল তাকে আটক করে। তার সাথে থাকা মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় ভারতীয় নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তা দেখতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।তিনি আরো জানান, তাকে কোনো যোগাযোগের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি মুম্বাইয়ের চেম্বুর ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে চার দিন আটকে রাখা হয়। স্বজনেরা পরিচয়পত্র ও নথিপত্র নিয়ে গেলেও তা বিবেচনা করা হয়নি। পরবর্তীতে তাকে বিমানে করে আসাম সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জোরপূর্বক বাংলাদেশে সীমানায় ঠেলে দেওয়া হয়। তাদের ৫-৬ জনের গ্রুপ করে সীমান্ত পার করার পর দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কোনো উপায় না পেয়ে এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় তিনি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় পৌঁছান।তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, আমার ২৩ ও ১৪ বছর বয়সী দুটি সন্তান ভারতে রয়েছে। আমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার গোবিন্দপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। গুগলে সার্চ করলে আমাদের বাড়ির সন্ধান মিলবে। আমি অবিলম্বে আমার নিজ দেশে এবং সন্তানদের কাছে ফিরে যেতে চাই।আশ্রয়দানকারী ভাদিয়ালি গ্রামের গৃহবধূ আরিফা বেগম জানান, তার স্বামী আবুল বাশার ডাক্তার দেখানোর জন্য ভাতরে থেকে ফেরার সময় বেনাপোলে নোংরা, কাদা-মাটি মাখা ও কায়িক যন্ত্রণায় কান্নাকাটি করতে থাকা সাইদা ফকিরকে দেখতে পান। আরিফা বেগম আরো বলেন, মেয়েটার অবস্থা দেখে যে কারও চোখে পানি আসবে। গায়ে কাদা-মাটি, জামাকাপড় ছেঁড়া এবং হাত-পা ফোলা অবস্থায় কান্নাকাটি করছিল। সে কান্নাকাটি করে বলছিল, ‘চাচা, আমারে একটু আপনার বাসায় নিয়ে যান, আমার ছোট বাচ্চা আছে ভারতে। আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই।’ মানবিক দিক বিবেচনা করে আমার স্বামী তাকে এনেছেন এবং গত পাঁচ দিন ধরে আমাদের এখানেই আশ্রয়ে রাখা হয়েছে।সাইদার পরিবার আরও দাবি করেছে, বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলায় অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতিতে সাইদাকে অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে আনার এবং এই বেআইনি পুশব্যাকের সুরাহা চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছে পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) এবং ভুক্তভোগীর পরিবার। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানিতে সাইদা ফকিরের ভোটার আইডি কার্ড, প্যান কার্ড, জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং পৈতৃক জমির দলিল তার ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। তবে আদালত এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি বলে ভুক্তভোগীর ছেলে জানিয়েছেন।




























