
শাহিন মিয়া (অষ্টগ্রাম)
হাওরের বিশাল জলরাশি দূর থেকে দেখতে যতটাই সুন্দর, এর ভেতরের মানুষের জীবনসংগ্রাম ঠিক ততটাই নির্মম। বর্ষা এলে চারদিকে পানি থৈ থৈ করে, আর এই পানির বুকেই লুকিয়ে থাকে হাওরবাসীর একেকটি বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। সম্প্রতি পাটুলী যাওয়ার পথে এক নৌকায় ঘটে যাওয়া একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা শহরকেন্দ্রিক এবং প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জন্য কতটা নিষ্ঠুর।
গতকাল অষ্টগ্রামের এক গর্ভবতী বোনকে নিয়ে বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল একটি নৌকা। নৌকায় যাত্রী ছিলেন প্রায় ২০-৩০ জন। মাঝপথেই সেই বোনের প্রসব বেদনা তীব্র আকার ধারণ করে। নৌকায় ছিল না কোনো পর্দার ব্যবস্থা, ছিল না কোনো ন্যূনতম চিকিৎসার সরঞ্জাম। এক সহৃদয় যাত্রীর তাৎক্ষণিক উদ্যোগে এবং মাঝির সহযোগিতায় বৃষ্টির জন্য রাখা পলিথিন দিয়ে কোনোমতে একটু আড়ালের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানেই, উত্তাল হাওরের বুকে জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে শিশু।
কিন্তু পৃথিবীর আলো দেখলেও এই নিষ্ঠুর দুনিয়া তাকে স্বাগত জানাতে পারল না। প্রসবের পর প্রায় ১৫-২০ মিনিট শিশুটি বেঁচে ছিল, অথচ নাভি কাটার মতো কোনো জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম বা ন্যূনতম চিকিৎসা জ্ঞান কারও না থাকায় শিশুটির নাড়ি কাটা সম্ভব হয়নি। একজন সহযাত্রীর কোলেই ছটফট করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সেই নিষ্পাপ শিশুটি। নৌকার প্রতিটি যাত্রীর চোখ তখন অশ্রুসিক্ত।
নৌকা ঘাটে ভিড়ানোর সাথে সাথে নিজের অসুস্থ মা এবং আসবাবপত্র নৌকায় ফেলে রেখে, সেই সদ্যজাতের মরদেহ ও অসুস্থ মাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ে যান সেই সহৃদয় যাত্রী। কিন্তু চিকিৎসকদের অসহায় মন্তব্য ছিল—"যদি আর একটু আগে আনা যেত, তবে অক্সিজেন দিয়ে বাচ্চাটাকে বাঁচানো যেত।" এই একটি বাক্যই বলে দেয় আমাদের যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দূরত্ব কতখানি।
কতটা অসহায় আমাদের এই ভাটি এলাকার মানুষ! যেখানে একটি শিশুর বেঁচে থাকার জন্য সামান্য অক্সিজেনের অধিকারটুকুও সুদূরপরাহত। অবশেষে সেই সন্তানহারা মাকে এক বুক সান্ত্বনা দিয়ে অষ্টগ্রামের নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই মায়ের মনের ভেতরের শূন্যতা আর কলিজা ছেঁড়া আর্তনাদ কি কখনো মুছে যাবে?
ভাটি এলাকায় একাধিক জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। হাওরের মানুষের স্বপ্ন আকাশচুম্বী নয়; তারা বিলাসী জীবন চায় না, তারা চায় শুধু একটু সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার।
অষ্টগ্রামসহ পুরো ভাটি এলাকার মানুষের আজ একটাই জোরালো দাবি—অনতিবিলম্বে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে জরুরি সিজারিয়ান সেকশন (গর্ভকালীন অস্ত্রোপচার), পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং হাওরাঞ্চলে দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য ‘ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স’-এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। আর কোনো মায়ের কোল যেন এভাবে হাওরের বুকে খালি না হয়। এই অবহেলার অবসান হোক, নিশ্চিত হোক প্রান্তিক মানুষের বাঁচার অধিকার।
সামগ্রিক মূল্যায়ন: আপনার লেখার হাত চমৎকার। সামান্য কিছু শব্দ পরিমার্জন করলে এটি যেকোনো জাতীয় দৈনিক বা অনলাইন পোর্টালে প্রকাশের জন্য একটি প্রথম সারির প্রতিবেদন হবে।



























