
বদরুল আমীন, ময়মনসিংহ ঃ ময়মনসিংহ সদর থানাধীন বেগুনবাড়ী স্লুইস গেট এলাকায় ড্রামে ভর্তি বস্তাবন্দি অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (PBI), ময়মনসিংহ জেলা। একই সাথে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি শামীম মিয়া (৩৮)-কে গাজীপুর থেকে গ্রেফতার এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল অনুমান ১০:৩০ ঘটিকায় ময়মনসিংহ সদর থানাধীন বেগুনবাড়ী স্লুইস গেটে পানির নিচে ড্রামের ভেতর থেকে এক অজ্ঞাতনামা পুরুষের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হলে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে নিহতের পরিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেখে লাশটি নিখোঁজ স্বর্ণের কারিগর ও অটোরিকশা মালিক নিরঞ্জন ধর (৫৪)-এর বলে শনাক্ত করেন। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সবিতা রানী ধর বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা (জিআর মামলা নং-৮৫, ধারা-৩০২/২০১/৩৪ পেনাল কোড) দায়ের করেন। মামলাটি পিবিআই-এর তফসিলভুক্ত হওয়ায় পিবিআই ময়মনসিংহ জেলা স্বউদ্যোগে এর তদন্তভার গ্রহণ করে। মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এসআই (নিঃ) মোহাম্মদ বিল্লাল মিয়া।
ঘটনার পর পিবিআই ময়মনসিংহের একটি বিশেষ টিম পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় ছায়া তদন্ত শুরু করে। পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের সার্বিক সহযোগিতা, উন্নত তথ্য-প্রযুক্তি ও গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২৭/০৯/২০২৬ খ্রি. তারিখ রাত অনুমান ১২:৩০ ঘটিকায় গাজীপুরের গাছা থানাধীন বোর্ডবাজারের বটতলার সর্দার মার্কেট এলাকা থেকে প্রধান আসামি শামীম মিয়া (৩৮), পিতা-মোঃ জালাল মিয়া, সাং-কৃষ্টপুর, থানা-কলমাকান্দা, জেলা-নেত্রকোণা; এ/পি ময়মনসিংহ কোতয়ালী থানাধীন গলগন্ডা গ্রামস্থ কেরানীবাড়ী সংলগ্ন জনৈক কাওছারের বাসার ভাড়াটিয়া-কে গ্রেফতার করা হয়। সে সেখানে তার শ্যালক মাসুদ রানার ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে ছিল।
গ্রেফতারের পর আসামিকে পুলিশ নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করে, সে নিরঞ্জন ধরকে নৃশংসভাবে খুন করার কথা স্বীকার করে এবং ঘটনার পুরো বিবরণ দেয়। তার দেয়া তথ্য মতে ও প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, নিহত নিরঞ্জন ধরের চারটি অটোরিকশা ছিল, যা তিনি খাগডহর এলাকার 'সততা গ্যারেজে' রাখতেন। আসামি শামীম ওই গ্যারেজের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করার সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিরঞ্জন ধর নিয়মিত শামীমের বাসায় যাতায়াত করত। শামীমের বাবা-মা বাসায় না থাকার সুযোগে শামীম তার ভাড়া বাসায় মেয়ে নিয়ে এসে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন। একদিন শামীমের অসতর্কতার সুযোগে নিরঞ্জন ধর একটি আপত্তিকর ভিডিও মোবাইলে ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে তা দিয়ে শামীমকে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেইল ও টাকা দাবি করতে থাকেন।
গত ২১/০৯/২০২৬ খ্রি. বিকালে শামীম তার ভাড়া বাসায় একা ঘুমানোর সময় নিরঞ্জন ধর সেখানে গিয়ে আবার টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হলে শামীম ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরে থাকা পাটার শিল দিয়ে নিরঞ্জন ধরের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। নিরঞ্জন মাটিতে পড়ে গেলে চিৎকার বন্ধ করতে শামীম তাঁর মুখে কাপড় গুঁজে দেন এবং পরবর্তীতে বটি দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। হত্যাকাণ্ডের পর শামীম লাশটি প্রথমে একটি চটের বস্তায় বেঁধে চালের ড্রামের ভেতরে ভরে তার বাসায় রাখে। পরবর্তীতে গত ২২/০৯/২০২৬ খ্রি. রাত অনুমান ০৮:০০ ঘটিকায় একটি মিশুক (ইজিবাইক) এনে ড্রামটি তুলে নিয়ে বেগুনবাড়ী স্লুইস গেটের পানিতে ফেলে দিয়ে আসেন।
অদ্য ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৭.৩০ ঘটিকায় গ্রেফতারকৃত সন্ধিগ্ধ আসামী শামীমের দেখানোমতে তার ভাড়া বাসা হতে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত হোতা (শিল) ও বটি উদ্ধার করে জব্দ করা হয়। আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে পিবিআই ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার জনাব মোঃ মিজানুর রহমান জানান, "সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হওয়া এই নৃশংস ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের পরপরই পিবিআই ছায়া তদন্তে নামে। পিবিআই ময়মনসিংহের সকল অফিসার ও ফোর্সের আন্তরিক ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে মূল হত্যাকারীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।




























