
সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো তহবিল ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে বিদ্যালয়ের দেড়শত শিক্ষার্থীকে স্কুল ইউনিফর্ম উপহার দিয়েছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শেখ মো. রকিবুল ইসলাম।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে কলেজ প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি করে গাছের চারাও উপহার দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই অঞ্চলের অনগ্রসর জনপদের শিক্ষার প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন অধ্যক্ষ শেখ মো. রকিবুল ইসলাম। অর্থাভাব এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে যাতে কোনো মেধাবী বা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থমকে না যায়, সেজন্য গত কয়েক বছর ধরে তিনি নিজ অর্থায়নে শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা জোগানো, বিনামূল্যে উন্নত মানের পাঠ্যপুস্তক ও খাতা-কলম সরবরাহ এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে অবৈতনিক অধ্যয়নের সুযোগ করে দিচ্ছেন। করোনাকালীন দুর্যোগেও তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পরম অভিভাবকের মতো। শিক্ষাক্ষেত্রে এমন অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তিনি উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক সিংড়া উপজেলার 'শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ' হিসেবে নির্বাচিত হন।
শিক্ষার্থীদের মাঝে সমতা, একতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে তিনি চলতি বছর ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য না নিয়ে নিজের বেতনের বড় একটি অংশ ও ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে সব শিক্ষার্থীর ইউনিফর্মের যাবতীয় খরচ একাই বহনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত শার্ট-প্যান্ট এবং ছাত্রীদের জন্য মার্জিত বোরকা উপহার দেওয়া হয়। প্রিয় অধ্যক্ষের কাছ থেকে এমন চমৎকার উপহার পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
অধ্যক্ষ শেখ মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, "আজকের এই আয়োজন আমার শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো করুণা নয়, তাদের অধিকার নিশ্চিত করার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ‘সবার জন্য মানসম্মত ও বৈষম্যহীন শিক্ষা’ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার বিকল্প নেই। অর্থাভাব যেন কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের প্রতিবন্ধক না হয় এবং পোশাকি বৈষম্য ভুলে প্রতিটি সন্তান যেন একই সমান্তরালে দাঁড়িয়ে শিক্ষার আলো গ্রহণ করতে পারে, সেই তাগিদ থেকেই আমার এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ। নতুন এই পোশাক শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও সমতার বোধ জাগ্রত করবে এবং আজকের দেওয়া চারাগাছ তাদের পরিবেশ সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে বলেই আমার বিশ্বাস।"
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভিপি ও এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ রিফাদ মাহমুদ। তিনি তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার উন্নয়নে অধ্যক্ষের এমন বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, "শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সমাজ সংস্কারে এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ তরুণ সমাজকে জনকল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করবে।"
এই আয়োজনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন। নতুন পোশাক ও চারাগাছ হাতে পেয়ে আনন্দের উচ্ছ্বাসে এক শিক্ষার্থী বলে, "সংসারের টানাপোড়েনে নতুন ইউনিফর্মের কথা বাড়িতে বলতে পারছিলাম না। প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করে দিলেন।"
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বেশ কয়েকজন অভিভাবক জানান, "বর্তমান বাজারে যেখানে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে সন্তানদের নতুন স্কুল ড্রেস ও বোরকা বানানোর বড় খরচটি স্যার একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তিনি আমাদের সন্তানদের পরম বাবার মতো আগলে রাখছেন। তাঁর এই ঋণ আমরা কখনো ভুলব না।"
অধ্যক্ষ শেখ মো. রকিবুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ৫ নং চামারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ মো. রাশিদুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চামারী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আল আমিন মৃধা (সাজু) এবং চামারী ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদ রানা।
উল্লেখ্য, এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন একটি তরুণ ও যুব-নেতৃত্বাধীন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসামগ্রী বিতরণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে সংগঠনটি।




























