
মো:ইয়াছিন সরকার কুমিল্লা মুরাদনগর প্রতিনিধি:কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং অবকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল এই হাসপাতালটি বর্তমানে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ২৮২ হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৭৩ জন। ফলে ১০৯টি পদ শূন্য রয়েছে। অনুমোদিত ১০ জন কনসালটেন্টের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। ৪৫ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন ২৩ জন। এছাড়া কয়েকজন চিকিৎসক প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত এবং কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত রয়েছেন।মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান বলেন, “বর্তমানে মাত্র ১০ জন চিকিৎসক দিয়ে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও জনবল অনেক কম হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”নার্সিং সেবাতেও রয়েছে বড় ধরনের সংকট। অনুমোদিত ৪২ জন নার্সের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৮ জন। তৃতীয় শ্রেণির ১৫৬টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১০২ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ২৯টি পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৪ জন।জনবল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবায়। নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন মাত্র একজন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন দুইজন। ফলে বিশাল হাসপাতাল চত্বরের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এক্স-রে টেকনিশিয়ানের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে সেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে রোগীরা নিয়মিত এ সেবা পাচ্ছেন না।হাসপাতাল এলাকায় চুরির ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, প্রায়ই হাসপাতাল চত্বরে চুরির ঘটনা ঘটে। পুলিশকে জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে বাদী না পাওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জটিল হয়ে পড়ে।এছাড়া হাসপাতালের চারপাশের সীমানা প্রাচীর বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, রোগী ও স্বজনদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে কর্মকর্তাদের আবাসন ভবনগুলোর বেশ কয়েকটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় দুই বছর আগে সংস্কারের জন্য আবেদন করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। কিন্তু সীমিত জনবল ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে তাদের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।এ বিষয়ে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, “সরকার স্বাস্থ্য খাতে ৫ হাজার চিকিৎসক, নার্সসহ প্রায় এক লাখ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জনবল সংকট অনেকাংশে কমে আসবে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হবে।”এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, জনবল সংকট, চিকিৎসকের স্বল্পতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অবকাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, সীমানা প্রাচীর সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করে বলেন, এলাকার কৃতী সন্তান ও সাবেক ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্জ কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ হাসপাতালটির উন্নয়নে বিশেষ নজর দিলে এটি একটি আধুনিক ও মডেল হাসপাতালে রূপান্তরিত হতে পারে।স্থানীয়দের মতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ, অচল স্বাস্থ্যসেবা চালু, নিরাপত্তা জোরদার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে মুরাদনগরের ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষ আরও উন্নত ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা লাভ করবেন।




























