
ময়মনসিংহ ব্যুরো। ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনের বদলি নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে প্রশ্ন উদয় হয়েছে। সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার তিন দিনের মধ্যে মনিকা পারভীনের বদলির আদেশ—এই সময়ক্রমই মূলত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রকাশ্য নথি ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘুষ চাওয়া বা নেওয়ার অভিযোগ মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে নয়। তার কার্যালয়ের দুই কর্মচারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ ও মোঃ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর ৩১ আগস্ট কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দিলেও তাতে কী পাওয়া গেছে বা কী সুপারিশ করা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।পরবর্তীতে ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশে মনিকা পারভীনকে ময়মনসিংহ সদর থেকে নান্দাইলে এবং নান্দাইলের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে সদরে বদলি করা হয়। আদেশে কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হয়েছে। বদলির সঙ্গে ঘুষের অভিযোগের সম্পর্ক আছে কি? ঘুষের অভিযোগের সূত্রপাত হয় ১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। তার মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগের প্রতিবাদে তিনি ‘ঘুষ.সাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শাহেদ শরীফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই। তাঁর বদলিকে ঘুষের অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার আগে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট প্রশাসনিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বদলির আদেশ জেলা কার্যালয় থেকে নয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মনিকা পারভীন প্রায় চার বছর একই কর্মস্থলে ছিলেন। সাধারণত তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, নান্দাইলের কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছা আগে থেকেই ময়মনসিংহ সদরে বদলির আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দুই কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে। ‘ঘুষ.সাইট’–সংক্রান্ত ঘটনার কারণে মনিকা পারভীনের বদলি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।শিক্ষক-অভিভাবকদের বক্তব্য, প্রশাসনের বদলি করার এখতিয়ার রয়েছে। তবে একই সঙ্গে দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে করা তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্ট করা উচিত।তাঁদের মতে, ৬ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল এবং মনিকা পারভীনের বদলির ‘জনস্বার্থ’ভিত্তিক প্রশাসনিক কারণ প্রকাশ করা হলে সৃষ্ট বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হতে পারে। এদিকে মনিকা পারভীন পুনর্বিবেচনার দাবিতে তার বদলি স্থগিতের আবেদন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী ময়মনসিংহে কর্মরত এবং তাঁদের একমাত্র মেয়ে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; ২০২৭ সালে মেয়েটির এসএসসি পরীক্ষার্থী। এ পরিস্থিতিতে অন্তত এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত বদলি স্থগিত রাখার আবেদন করেছেন তিনি। একই সাথে তাঁর আবেদনের সমর্থনে ময়মনসিংহ সদর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে বদলি পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছেন।সব মিলিয়ে, মনিকা পারভীনের বদলি, দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ এবং তদন্ত—তিনটি বিষয়কে পৃথকভাবে দেখাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা দাবির কোনো সরাসরি অভিযোগ নেই। তাঁর বদলির প্রশাসনিক কারণ এবং দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্তের ফলাফল স্পষ্ট করা উচিত।একই সঙ্গে শিক্ষক-অভিভাবকদের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যেন অভিযোগের অনুমান নয়, বরং নথি, প্রমাণ ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে হয়।
























