
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬ ফল প্রকাশের দিনটিতে কারও ঘরে ছিল আনন্দ, কারও মুখে স্বস্তি, আবার কারও চোখে হতাশা। বহুদিনের অপেক্ষার পর পাওয়া এই ফল শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু ফলের আনন্দ-বেদনা পেরিয়ে আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়-আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কোন পথে এগোচ্ছে?এবারের এসএসসি ঘিরে পরিস্থিতিটা কিছুটা ভিন্ন ছিল। নতুন সরকার, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ, নীতিগত নানা সিদ্ধান্ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ফল প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ কম ছিল না। এর মধ্যেও যারা সাফল্যের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের অভিনন্দন প্রাপ্য। কারণ একটি অনিশ্চিত সময়ের মধ্যেও তারা নিজেদের জায়গা থেকে চেষ্টা করেছে।তবে শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। যারা প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি কিংবা কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদেরও মনে রাখতে হবে-এসএসসি জীবনের শেষ পরীক্ষা নয়। বরং এখান থেকেই জীবনের আরও বড় প্রতিযোগিতা শুরু। একটি ফলাফল কখনোই একজন মানুষের পুরো সামর্থ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে না।গত কয়েক বছরের এসএসসি ফলাফলের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট-পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কেউ এটিকে শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যায়নের মান ফিরে আসার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন শিক্ষার্থীরা পরিবর্তিত ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছে। সত্যটা সম্ভবত এর মাঝামাঝি কোথাও। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার সংকট শুধু পরীক্ষার ফলাফলে আটকে নেই। কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখার সমস্যা-সবকিছু মিলেই একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, সংকট দেখা দিলেই আমরা সমাধানের চেয়ে দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠি। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের দায়ী করে, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের, অভিভাবকেরা অনেক সময় শিক্ষকদের এবং সরকার আগের সরকারের দিকে আঙুল তোলে। কিন্তু প্রত্যেক পক্ষ যদি শুধু অন্যের ভুল খুঁজতেই ব্যস্ত থাকে, তাহলে সমস্যার সমাধান করবে কে?শিক্ষকদের একটি অংশের অভিযোগ, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আগের মতো মনোযোগী নয়। কথাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্টফোন ও বিনোদনের সহজলভ্যতা শিক্ষার্থীদের মনোযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পুরো প্রজন্মকে ‘অবাধ্য’ বলে দায়মুক্ত হয়ে যাওয়া যাবে। ১৪–১৫ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থীর চঞ্চলতা বা অমনোযোগ অস্বাভাবিক কিছু নয়। একজন দক্ষ শিক্ষক জানেন, শুধু শাসন করে নয়-শিক্ষার্থীকে বোঝার মাধ্যমেও তাকে শেখানো যায়। পাঠদানে কিছুটা বৈচিত্র্য, সহজবোধ্য উপস্থাপন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।তবে এখানেও শিক্ষকদের একা দায়ী করলে হবে না। একটি শিশুর আচরণ ও মূল্যবোধ তৈরির প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। সন্তান শিক্ষক সম্পর্কে কোনো অভিযোগ করলে অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু শিক্ষকের ওপর আঙুল তোলা নয়; আগে বোঝার চেষ্টা করা, সমস্যাটি কোথায়।সন্তানের মধ্যে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, ভদ্রতা এবং বড়দের প্রতি সম্মান—এসব গুণ পরিবার থেকেই তৈরি হয়। আবার শিক্ষার্থীরও বুঝতে হবে, নিজের ভবিষ্যতের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তাকেই নিতে হবে। ‘প্যারা নাই, চিল মামা’ মানসিকতা দিয়ে হয়তো কিছু সময় পার করা যায়, কিন্তু জীবনকে এগিয়ে নেওয়া যায় না।সরকারের কাছেও প্রত্যাশাটা খুব বেশি নয়। শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন, কিন্তু সেই পরিবর্তন যেন বারবার পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে না আসে। একটি নীতি গ্রহণের আগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রস্তুত করা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পুরোনো ব্যর্থতার হিসাব দিতে গিয়ে বর্তমানের দায়িত্ব যেন আড়ালে না পড়ে। অতীতে কী ভুল হয়েছে, তা জানা প্রয়োজন; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এখন কী করা হচ্ছে।শেষ পর্যন্ত এসএসসির ফলাফলকে শুধু পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫-এর সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে আমরা আসল জায়গাটাই মিস করব। প্রশ্ন হওয়া উচিত-আমাদের শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, কতটা দক্ষ হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে?যে শিক্ষার্থী এবার ভালো করেছে, তার জন্য অভিনন্দন। যে পারেনি, তার জন্যও দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। আর আমাদের জন্য এই ফলাফল একটি সুযোগ-শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবার। কারণ আমাদের লক্ষ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়; এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি দক্ষ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হবে।লেখকঃআরাফাত অনন্ত তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





























