
মো কামরুল হোসেন সুমন,মনপুরাঃসামুদ্রিক মৎস্য সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে আগামীকাল ১১ জুন।ফলে ভোলা জেলার প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৭১ হাজারের মতো। এর মধ্যে সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৬৪ থেকে ৬৫ হাজার জন জেলে রয়েছেন যারা মূলত সাগরগামী বা ইলিশ অভয়াশ্রম এলাকার আওতায় মৎস্য শিকারের সাথে সরাসরি জড়িত।সমুদ্রগামী জেলেদের চলছে সাগরে যাওয়ার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।ঘাটে নোঙর করে রাখা হয়েছে সমুদ্রগামী ট্রলার। মৎস্য আড়ত গুলোতে এখনও শুরু হয়নি কোলাহল, নেই মাছ বেচা-কেনার হাক-ডাক। তবে জেলেদের মাঝে বেড়েছে শেষ সময়ের ব্যস্ততা। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ বুনছেন নতুন জাল। আবার কেউ ট্রলার ঠিকঠাক করে সাগর যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দীর্ঘ ৫৮ দিনের অপেক্ষার পর প্রায় শেষ পর্যায়ে তাদের প্রস্তুতি।নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় দুই মাস সাগরে মাছ শিকার বন্ধ ছিল। এ সময়ে অনেক জেলে পরিবার আর্থিক সংকটে পড়লেও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেছেন তারা। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন জেলেরা।এ দিকে মনপুরার কয়েকটি মৎস্য ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে সারি সারি নোঙর করে রাখা হয়েছে মাছ ধরার ট্রলার। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ট্রলারগুলোতে চলছে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি। কেউ ট্রলারে রং করতে ব্যস্ত আবার কেউ তড়িঘড়ি করে ট্রলারে উঠাচ্ছেন জাল। অন্যদিকে যে মৎস্য ঘাটে প্রতিদিন ভোর থেকে চলত লাখ লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা, সেখানে এখন বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা।সাগরে গিয়ে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়ার আশায় কেউ কেউ বুনছেন জাল।সমুদ্রগামী জেলেরা জানান, প্রায় দুই মাস নিষেধাজ্ঞায় পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছেন। ধার দেনা করে কোনো রকম চলছে তাদের জীবন। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গিয়ে প্রত্যাশিত মাছ আহরণ করতে পারলে ধার দেনা কিছুটা পরিশোধ করে পরিবার নিয়ে সুখে থাকবেন বলে মনে করছেন তারা। তবে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তা যুক্ত হয়েছে জেলেদের। পর্যাপ্ত মাছ আহরণ করতে না পারলে আর্থিকভাবে ক্ষতি হবেন তারা। মহাজন ও এনজিওর ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কাটছে তাদের দিন।সমুদ্রগামী জেলে নোমান মাঝি বলেন, ‘সরকারের দেয়া নিষেধাজ্ঞা এখন শেষ সময়ে। আমরা সাগরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেছি। আশাকরি সাগরে গিয়ে অনেক মাছ-পাব। দুই মাসে যা দেনা হয়েছে মাছ বিক্রি করে সেই দেনা কাটাবো। গত বছর ভালো মাছ পেয়েছি, এ বছরও আশা করি অনেক মাছ পাবো আর ধার দেনা পরিশোধ করতে পারমু।’জেলে মহিউদ্দিন মাঝি বলেন, ‘৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা ছিল। এখন সাগরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। কেউ ট্রলারের রঙের কাজ করতেছে, আবার কেউ জাল উঠাইতেছে। বিভিন্ন জায়গার জেলেরা সবাই একত্রিত হইতাছে সাগরে যাওয়ার জন্য। অনেক কষ্ট করে সবাই সাগরে যাইতেছে। যদি মাছ পাই তাহলে ঋণ পরিশোধ করতে পারব। আর যদি না পাই তাহলে অনেক কষ্ট হবে। পরবর্তীতে আর যাইতে পারব কিনা সন্দেহ।’মনপুরার জনতা বাজার সমুদ্রগামী ট্রলার আড়তদার সিরাজ পালোয়ান বলেন, আমাদের ট্রলার মেরামত কাজ কমপ্লিট হয়ে গেছে। জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত বছরে নিষেধাজ্ঞা শেষে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যায়নি। এ বছর কি হবে উপরওয়ালাই ভালো জানে। সাগরে যদি টলিং জাহাজ বন্ধ হয় তাহলে সাগরের মাছের অভাব হবে না। কিন্তু জেলেরা সাগর থেকে ফিরে এসে বলে টলিং জাহাজ লক্ষ লক্ষ টাকার জাল নষ্ট করে। এই জাহাজ ইলিশ মাছ সহ অন্যান্য মাছের রেনু পোনাগুলো মেরে ফেলছে। এগুলো দেখার সাগরে কেউ নেই। একটা ট্রলার সাগরে পাঠাইতে আমাদের সবকিছু মিলিয়ে ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ লক্ষ টাকা খরচ হয়। গত বছর যেভাবে মাছ পায় নাই, এ বছরেও যদি একই রকম অবস্থা হয় তাহলে আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে যাব। আমার তিনটি ট্রলার ছিল, যার দুটি ট্রলার বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। এ বছর যদি পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়া যায় তাহলে পরবর্তীতে সাগরে যাওয়ার আর কোন অবস্থা থাকবে না।এদিকে এক ব্যাক্তি জানান,নিবন্ধিত জেলেরা সরকারি সহায়তা পান। আর অনিবন্ধিত জেলেরা এই সুযোগ সুবিধা পায় না। তাদের দাবি নতুন করে জেলেদের নিবন্ধন করলে তারা উপকৃত হতে পারত।মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘সারা বাংলাদেশের মতো মনপুরা উপজেলার আওতার জেলেরা ৫৮ দিনে নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে সাগরে যাবে। ইতঃপূর্বেই সমুদ্রে যাওয়ার জন্য জেলেরা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আশা করি জেলেরা সমুদ্রে পর্যাপ্ত মাছ পাবে এবং তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবে। মানপুরায় মাছের দাম সহনশীল পর্যায়ে আছে বলে আমি মনে করি।গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে মিল রেখে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এ বছর প্রচুর মাছ মিলবে বলে প্রত্যাশা জেলেদের।




























