
মায়াবী জলের বাঁকে
মো. সেলিম হাসান দুর্জয়
যমুনা নদীর দক্ষিণ পাড় ঘেঁষা শান্তির চর। শরৎ কিংবা বসন্তে এ চর থেকেই দিগন্ত শুরু হয়ে মিলিয়ে যায় শূন্যে। দিগন্ত যেখানে শুরু ওখানেই আমার ঘর। ছোট্ট খুব ছোট্ট ফিনফিনে ছনের ঘর। সকালের মিষ্টি আলো মুখে পড়লে আমার ঘুম ভাঙে। দুপুরের নিষ্ঠুর অগ্নি আলোয় আমি কাজে সাময়িক বিরতি দিয়ে ঘরে ফিরি। বিকেলের হলুদ আলোয় আমি জীবনের হিসেব কষি। যমুনার ঘোলা জলে প্রতিদিন আমার স্বপ্নগুলো সাঁতার কাটে। বালুর চিকচিকে দানার উপর আমি স্বপ্ন আঁকি ইঁদুরের চোখে। নদীর অবাধ্য ঢেউ উপচে পড়ে আমার স্বপ্নের শিল্প গহ্বরে। মুহূর্তে মুছে যায় আমার আল্পনার সকল রং। আমি অলস চোখে দূরে তাকাই, অনেকদূর! নদীর ঐ পাড়ের সভ্যতার জঙ্গলগুলো আমাকে ব্যঙ্গ করে রক্তমাখা বিষাক্ত দাঁত কেলিয়ে। আমি ভয়ে চোখ বুজি। যমুনার জলে গোত্তা খাওয়া হিমেল হাওয়ায় আমাকে ভাসিয়ে নেয়। সাদা মেঘের ভেলা নেমে আসে শান্তির চরে। চোখ খুলে দেখি- খোলা জলরাশি। সফেদ ঢেউ, তটরেখায় অপেক্ষারত রাঙা নৌকো। গভীরে আরো গভীরে মায়ারী জলের বাঁকা হাসি। সর্ষে ফুলের চাহনি চোখে সে-কি মায়া! ডাকে! সমু্দ্রস্নানে কপোল ধোয়া পানি বাষ্পীভূত হয় শুভ্র ছোঁয়া আলোর টানে। সীতাহার গলার ভাঁজে প্রিয়ঙ্গু ফুলের জলছবি আমাকে ডাকে।
আমি বিচলিত হয়ে উঠি মায়ার টানে। খটখটে রোদে দগ্ধ হৃদয় কেমন আকুল হয়! শীতল হওয়ার মিহি তাড়া কম্পন জাগায় শাশ্বত বাসনার উতলা পালে। আমি এগিয়ে চলি...ধীরে খুব ধীরে, বিড়াল পায়ে। পেছনে ফেলে নাড়ি পোতা শান্তির চর, ছনের ঘর, সীমানা ঘেরা যমুনার ঘোলা জল আর বিনা কড়িতে পাওয়া দিগন্ত শোভা। মধ্যাহ্নের কাজল ডাকে রাঙা নৌকোর পাল ভাসিয়ে আমি এগিয়ে চলি। মুহুর্মুহু বাতাসের শব্দমিতালি অসীম সাগরের কলতানে আমি অভিভূত! এই তো সেই মায়াবী জল! যমুনার ঘোলা জলে আমি কতকাল তোমায় খুঁজেছি। তুমি নও, তোমার পায়েলের নিক্বণ ধ্বনি রোদের প্রতিবিম্বে আমায় স্বপ্নে ভাসাতো। চারিধার কত জল! তবুও আমি তৃষ্ণার্ত থেকেছি শতবছরের আক্ষেপের কপাট খুলে। তুমি ঠিক আমায় ডাকবে! মায়াবী ঠোঁটের আজন্ম তৃপ্তির অপার অসীম হয়ে ভরিয়ে দিবে আমার আজন্ম লালিত প্রেমিক সত্তা। আমার পুরুষত্বের কালিমালিপ্ত লালসার রস প্রেমের কাব্যরথে পাবে পূর্ণতা। ঐতো! দেখো, তোমার বাঁশরি চওড়া নাকের ভাজে আমার সে-কি তৃপ্তি! তোমার ঠোঁটের পৃষ্ঠ ছোঁয়া গেরুয়া লোমকূপে সঞ্চিত হাসির বিন্দুকণা, এ যে মানবী! এ যে অস্পর্শ সুরভি! এ যে আমার আরাধ্য আরাধনা প্রেমের সঞ্জীবনী। এ যে দিগন্ত থেকে খসে পড়া অপার সৌন্দর্য চিকচিকে সাগরের বুকে। মনোহারিণী, মায়াবী জল, অথই পথের চির আকর্ষণ, আজ আমি তোমার খুবই সন্নিকটে। বলতে পারো- প্রেমস্বর্গের ফটক ধারে। এবার আসো, মায়া নয় কায়া হয়ে। আমি আজ পূর্ণ, আমি আজ পূর্ণ। হে মায়াবী জল, বন্ধ করো তোমার বাঁকা চোখের মিষ্টি হাসি। আমি যে ভঙ্গুর অতি! তোমার স্পর্শে আনো আমার নুইয়ে পড়া অশান্ত অনুভবে প্রেমসঙ্গীত। আহ! অবশেষে! সেই স্পর্শ, চিরকাঙ্ক্ষিত অনুভব। তোমার নিঃশ্বাসের সুগন্ধি আমার অনুভব ভেদ করে ছুঁয়েছে প্রেমের শাশ্বত মুক্তির স্বাদ।
অনুভবে এতটা তৃপ্তির আয়োজন, সে তুমি ছাড়া থেকে যেতো চির অচেনা। অমৃতা, মায়াবী অমৃতা আমার, এ জনম আজই ধন্য, পূর্ণ। অনাদিকাল এভাবেই কেটে যাক পাশাপাশি ছুঁয়ে থাকা। মিলনে,মহামিলনে আজ বাড়ালে ঋণের পাহাড়। শুধিব, সে সাধ্যি কোথা! এ কি! তোমার হাসির কল্লোলে যে উদ্বেলিত সাগরের শান্ত জল। থামাও, থামাও তোমার হাসি। আমার শীর্ণ নৌকো ভয়ে টলমল। চারিপাশ শুধুই জল। তুমিই তো আমার পরম আশ্রয়, মহাশক্তি। আমি আজ নির্ভয়। চক্ষু রাঙিয়ে তোমার মহা গর্জন - লালসায় মত্ত ভোগবাদী হে কামুক বিস্ময়। আমি ভয়ে শিউরে উঠি। আমার পূর্ণতার ললাট ভরে উঠে শঙ্কার বিন্দু ঘামে। বিশ্বাস করো - হে মায়াবী জল, আমি এসেছি পবিত্র প্রেমের সুধা আমার গায়ে মেখে তোমার হৃদয়পটে। আমি যে তোমার স্পর্শ পানে আজ শুদ্ধ প্রেমিক সত্তা। আমি লালসায় মোড়ানো কোন রক্তপিণ্ড নই! আমি প্রেমের দুর্বার শক্তি জাগ্রতচিত্ত। বিশ্বাস করো, বিশ্বাস করো আমায়! থামাও, থামাও তোমার খিলখিল হাসি। তরী যে ডুবে যায়! আমার ভয় হয়!
রাঙিয়ে ব্যঙ্গ হাসি তোমার শেষ উক্তি- পুরুষ! কাপুরুষ! ভোগী! অমানুষ! আমার ভয় দেখে তুমি ভাবছো, আমি কাপুরষ, প্রেমিক নই! তাই না?
হে মায়াবী জল, আমি তোমার বাঁকা ঠোঁটের পূজারি ছিলাম। আমি তোমার মৃদু হাসির ছন্দ ছিলাম। আমি তোমার মানবী রূপের মহানন্দ ছিলাম। আমি তোমার আনন্দের উৎস ছিলাম। আমি তোমার সম্ভ্রম আর নারীত্বের আব্রু ছিলাম। আমি ছিলাম তোমার এক অবারিত মুক্ত আকাশ। আমার জন্য নয়, তোমার জন্য ভয় হচ্ছে। হারালে... হারালে। আমার নৌকো, রাঙা নৌকো! আমার ফিনফিনে ছনের ঘর! যমুনার ঘোলা জল! ফুসফুস ভরে উঠে উত্তাল লোনাজলে।
নির্নিমেষ চোখ যুগল তখনো তাকিয়ে রয়। ফুসফুস নিঃসৃত শেষ অক্সিজেন বিন্দুকণা বুদবুদ করে উগরে আসে চিরমুক্তির অবারিত আকাশপানে।







































