
জন্ম
আমার খোকা। চোখের সামনে ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা গুলো ছুড়তে ছুড়তে কখন যে এতো বড় হয়ে গেল! ক্লান্তিকর অফিস শেষ করেই আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে দিয়ে গেল। আমার বয়স হয়েছে। অসুস্থ থাকি প্রায় সময়। দাদু ভাইয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে তাই দুই বাপ-বেটা মিলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দাদু ভাইয়ের জন্য একটা সুস্থ পরিবেশ দরকার। আমার বয়স তখন পঁয়ত্রিশ। নতুন দাপুটে আমলা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সম্মান, ক্ষমতা, চলার মতো আর্থিক সংগতি সবই ছিল। শুধু ছিল না সন্তান। এ নিয়ে আমার তেমন মাথাব্যথা না থাকলেও আশপাশের চল্লিশ বাড়ি ছাড়িয়ে চল্লিশ হাজার বাড়ির মানুষের চোখে ঘুম ছিল না। সবাই না পারলেও কেউ কেউ শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত বুঝানোর চেষ্টা করতো - পৃথিবীতে আসা পুরোটাই বৃথা সন্তান ব্যতীত। আমি বিস্মিত হতাম মানুষের এমন জীবন দর্শনে। হাসিও পেতো। তবুও সমাজের আদিমযুগীয় কুসংস্কার উপেক্ষা করতে পারিনি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি বিশেষ চিকিৎসায় চল্লিশের কাছাকাছি সময়ে খোকার জন্ম।তারপর দেখতে দেখতে কাঁচা চুল সাদা হলো। খোকার মা-ও এক সময় ওপাড়ে পাড়ি জমালো। আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে অবসরে আসলাম। সারাজীবনের সঞ্চয়, প্রভিডেন্ট ফান্ড সবমিলিয়ে খোকার ভবিষ্যত চিন্তায় ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট নিলাম। ঘণ্টা কয়েক আগে সেখানেই ছিলাম। খোকার মাকে খুব মনে পরছে। হয়তো সে থাকলেও খুব খুশি হতো। যাক, ছেলেটা অফিসে নিশ্চিতে থাকতে পারবে এখন। আশীর্বাদ করি, দাদু ভাই অনেক বড় হও। নিঃশ্বাসের আদ্রতায় ফ্যাকাসে চশমার উপরিতল চুইয়ে একফোঁটা পানি মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে।
উদ্ভ্রান্ত
মধ্যদুপুর। গাজীপুর চৌরাস্তা। ফ্লাইওভারের কাজ চলছে।চারিদিকে কনস্ট্রাকশনের অশ্রাব্য শব্দ, অসহ্য জ্যাম,গিজগিজ করছে পথচারী। নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ির হুইসেল। জাগ্রত চৌরঙ্গীর গা ঘেঁষা ফ্লাইওভারের নিচে উদভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে কমদামি সিগারেট ফুঁকছে একের পর এক। খোচাখোচা দাড়ি, উসখুস চুল, পরনে নোংরা শার্ট-প্যান্ট আর উদাসীন ভারসাম্যহীন চাহনি। হাতে চকচকে অফসেট একখানা পেপার। চাকরিচ্যুত হওয়ার সরকারি আদেশ। কেউ একজন পানের পিক ফেলে। প্যান্টের পদতল স্পর্শ করে ময়লায় আবৃত জুতোর খানিকটা লেপটে যায়। পথচারী বিব্রতবোধ করলেও চ্যাদভ্যাদ শূন্য নির্বিকার থাকেন তিনি। সিগারেট ফুঁকেই যাচ্ছেন। উনি আর কেউ নন, সুনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী জনপ্রিয় শিক্ষক। তিনি সুবক্তা এবং সুলেখকও বটে। বছরখানেক আগে শিক্ষা গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। যেখানে পরিচয় ঘটে সদ্য নিয়োগ পাওয়া এক অপরূপা লাস্যময়ী নারীর সাথে। তিনিও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তাঁর ভাষ্যমতে, তাঁর চোখে দেখা পৃথিবীর সমগ্র সৌন্দর্যের সমগ্র নির্যাস অঙ্গে মেখে দৈহিক সৌষ্ঠবে নিখুঁত দেবীর মানবী রূপে আবির্ভূত হয়েছে যেন সে। প্রথম দেখাতেই তাঁর মায়াবী চোখের, নান্দনিক নাকের আভায়, বিনয়ী আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দিত মোহনীয় অস্পৃশ্য মিষ্টি হাসির মোহ মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। কি অপূর্ব সুমধুর বাচনভঙ্গি, আচরণে ঠিক যেন বিনয়ের অবতার! তারপর হেঁটে চলা, কথা বলা, বিনিময়, আদানপ্রদান। মনের দেহের। বেশ চলছে। যেন স্বর্গলাভে অমিয় তৃপ্তি তরুণ এই শিক্ষকের মনে মননে। সময় গড়ায়, গড়ায় সূর্যের তাপ। ওপাশে বরফ গলতে থাকে অন্য কোনো নক্ষত্রের তাপে। এপাশে সমুদ্রের উপরিভাগে মাতাল লোনাজল প্লাবিত করে তরুণ সুলেখক, মেধাবী তরুণ শিক্ষকের মিঠাপানির জলাশয়। জল অনেক গড়ায়। হঠাৎ পাওয়া স্বর্গানন্দে এতো বৈপরীত্য! বিভৎস সে বৈপরীত্য! ভয়ংকর সে বদলে যাওয়া! মানতে পারেননি তিনি! সবাই সব পারে না!
ভালোবাসা
আমি তোমাকে ভালোবেসেছি আমার হৃদয়ে, আত্মায় এবং আমার নিজস্ব রংতুলিতে। তোমার অক্ষমতা অপারগতা সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেছি তোমার চোখে তাকিয়ে আমার চোখের প্রতিবিম্বে। তাই আমি তোমাকে হারাইনি। তুমি আমাকে জাজ করেছো তোমার চোখে সবসময় তোমার মতো করে। তাই তুমি আমাকে নয়, তোমাতেই ঘুরপাক খেয়েছো আত্ম ছলনায়। তুমি আমাকে চিনতেই পারোনি! আমার প্রেমের প্রতিবিম্বে তুমি কেবল তোমাকেই দেখেছো। প্রতিবিম্বের পৃষ্ঠা উল্টালেই তুমি আমাকে পেতে, পেতে শাশ্বত প্রেমের অমিয় মিলনের তৃপ্তি। তেমনটা ঘটেনি! অধিকাংশ ভাঙ্গনে যা ঘটে আর কি! আর তাই তুমি আমাকে হারিয়ে ফেলেছো তোমার অগোচরে, বুঝতেই পারোনি! আমি তোমার হৃদয়ের সুরভি চোখে মেখে তোমাকে ভালোবাসতে বাসতে কাটিয়ে দিব বাকি জীবন। আর তুমি- আমার প্রতি একবুক ঘৃণা নিয়ে কীভাবে হাঁটবে বাকিটা পথ!!







































