
গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের তৎপরতা। একদিকে জামায়াতে ইসলামী আট দফা দাবিকে সামনে রেখে কর্মসূচি ও লং মার্চ নিয়ে ব্যস্ত; অন্যদিকে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম, কমিটি গঠন এবং অভ্যন্তরীণ পক্ষ-বিপক্ষের কর্মসূচি ঘিরে রাজনীতি সরগরম। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সাতক্ষীরায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একের পর এক প্রকাশ্য তৎপরতা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে- এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি সংগঠনগুলোর মাঠে ফেরার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ?অতি সম্প্রতি ঘটা কয়েকটি ঘটনা থেকে প্রতীয়মান যে, প্রকাশ্য রাজপথ থেকে দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা আওয়ামী লীগ-ঘরানার কিছু নেতা-কর্মী আবারও বিচ্ছিন্নভাবে মাঠে নামছেন। এর মধ্যে রয়েছে ঝটিকা মিছিল, মশাল মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ-সংক্রান্ত মামলা এবং একাধিক নেতাকর্মীর গ্রেপ্তার।রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সাতক্ষীরায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি ঝটিকা মিছিলের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- শহরের একটি তুলনামূলক ফাঁকা সড়কে মিছিলটি বের হয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়। মিছিলকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনের ব্যানারে প্রকাশ্যে মিছিল করার মতো ঘটনা কীভাবে ঘটল- তা নিয়েই আলোচনা বেশি।এর আগে চলতি বছরের ১৪ আগস্টও সাতক্ষীরা বাইপাস সড়ক এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একাংশ ঝটিকা মিছিল করেছিল বলে একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই মিছিলের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ নেতা মৃণাল মণ্ডলের নাম আসে। পুলিশ তখন ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ফলে সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না- সেটিও এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।এর মধ্যেই শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সাতক্ষীরায় যুবলীগের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার যোগরাজপুর এলাকায় দা, লাঠি ও মশাল নিয়ে মিছিল করার অভিযোগে জেলা যুবলীগের আহবায়ক মিজানুর রহমান মিজান, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা অহিদ পারভেজসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬০ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।অর্থাৎ, একই সময়ে একদিকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, অন্যদিকে যুবলীগের মিছিল ঘিরে মামলা- দুটি ঘটনাই সাতক্ষীরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।এর একদিন পর শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) শ্যামনগর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মাহাবুব বাবুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শ্যামনগর থানা পুলিশ জানায়, পৌরসদরের নকিপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বংশীপুর এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তার নাম আসামির তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ঘটনায়ও তার নাম এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।সাতক্ষীরার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট- আইনি ও রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকার পরও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতা-কর্মী পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাননি। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য রয়েছে। কয়েকটি মিছিল, মামলা বা গ্রেপ্তারের ঘটনা থেকে পুরো সংগঠন একটি পরিকল্পিত নাশকতা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো সামনে না আসলেও এলাকাভিত্তিক শোনা যাচ্ছে একথা।কিন্তু একই সঙ্গে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে বারবার ঝটিকা মিছিল, মশাল মিছিল এবং নাশকতা-সংক্রান্ত মামলার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সতর্কবার্তা তৈরি করছে।স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক পরিচিত নেতা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। কেউ কেউ প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে পোস্ট, মন্তব্য ও হুমকিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন- এমন অভিযোগও রয়েছে।সবমিলিয়ে ঝটিকা মিছিলের পর সাধারণ মানুষের একটি প্রশ্ন- নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কীভাবে এত অল্প সময়ে জড়ো হয়ে প্রকাশ্য সড়কে মিছিল করে আবার নির্বিঘ্নে সরে যেতে পারছেন?এর আগের একটি মিছিলের ঘটনায় সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আমিনুর রহমান জানিয়েছিলেন, তিনি বিষয়টি আগে থেকে জানতেন না; সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ঘটনার পর বাইপাস ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর কথাও পুলিশ জানিয়েছিল। কিন্তু দৃশ্যমান কোন তৎপরতা দেখা আজো দেখা যায়নি।এ কারণে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সামনে আসার পর প্রশাসনের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন নতুন করে উঠেছে- মিছিলের আগে গোয়েন্দা নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল, মিছিলের সঙ্গে জড়িতদের কতজন শনাক্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং একই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নাকি গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি- কোনটি দায়ী, তা স্পষ্ট হবে।সাতক্ষীরার রাজনৈতিক মহলে আরেকটি প্রশ্ন ঘুরছে- মাঠপর্যায়ের কর্মী বা অপেক্ষাকৃত নিম্নপর্যায়ের নেতাদের গ্রেপ্তার করলেই কি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে? শনিবার সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা লালটুকে আটকের তথ্য স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, যেসব নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ বা মামলা রয়েছে, তাদের সবাই কি আইনের আওতায় আসছেন?অন্যদিকে সাতক্ষীরার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেও বিভিন্ন ইস্যুতে পরস্পরকে দোষারোপ, রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে টানাপোড়েন এবং মাঠের প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে।রাজনীতির এই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব যদি বাড়ে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিএনপি-জামায়াতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধকে আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের নাশকতার পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।সাতক্ষীরার বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াত- কে মাঠে বেশি শক্তিশালী, তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে কোনো পক্ষ যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা যেন কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কাছে জিম্মি না হয়।সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিল, মশাল মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ-সংক্রান্ত মামলা এবং ধারাবাহিক গ্রেপ্তার- সব মিলিয়ে সাতক্ষীরায় রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি নতুন অধ্যায় তৈরি হচ্ছে কি না, তা এখন নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।




























