
মোঃ কাওছার আহম্মেদ, গাইবান্ধা ঃ
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের তরফ কামাল গ্রামে শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন তিন গম্বুজ জামে মসজিদ। ইতিহাস, বিশ্বাস, জনশ্রুতি ও রহস্যের মিশেলে গড়ে ওঠা এই স্থাপনাটি আজও এলাকার মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয়দের মধ্যে মসজিদটির বয়স নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। কেউ একে প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো বলে দাবি করেন, আবার অনেকের মতে এর বয়স ৭০০ বছরেরও বেশি। লিখিত কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল না থাকলেও, এর গঠন ও নকশায় মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর স্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায় বলে মত দিয়েছেন অনেকেই।
একতলা বিশিষ্ট তিন গম্বুজের এই মসজিদটির দেয়ালের সূক্ষ্ম কারুকাজ, প্রাচীন ইটের বিন্যাস এবং নান্দনিক প্রবেশদ্বার অতীত ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি বহন করছে। সময়ের ক্ষয়চিহ্ন সত্ত্বেও এর স্থাপত্য এখনো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
মসজিদের মোয়াজ্জেম শাহাদুজ্জামান বলেন, “এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থান নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে।”
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম জানান, “এটি আমাদের এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মসজিদটির অবস্থা ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
স্থানীয় এক গ্রাম্য চিকিৎসক জয়নাল আবেদীন বলেন, “শৈশব থেকে এই মসজিদকে ঘিরে নানা গল্প শুনে বড় হয়েছি। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের অংশ।”
স্থানীয়দের বিশ্বাস, কোনো এক অলি-আউলিয়ার মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের সময় এই মসজিদটির প্রতিষ্ঠা হয়। মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন কবরস্থান, যেখানে বহু সম্মানিত ব্যক্তির সমাধি রয়েছে বলে জানা যায়। এলাকাবাসীর কাছে এটি পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।
এলাকায় প্রচলিত একটি রহস্যময় জনশ্রুতি অনুযায়ী, মসজিদে একসময় একটি ফারসি লিপিযুক্ত পাথর ছিল, যা কখনো কখনো ‘ঘেমে উঠত’ এবং তার পরপরই বৃষ্টি হতো। যদিও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি, তবুও এটি স্থানীয়দের কাছে বিস্ময়কর ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।
প্রবীণদের মতে, অতীতে এই স্থানে মক্তব, মাদ্রাসা ও অতিথিশালার অস্তিত্ব ছিল, যা সময়ের পরিবর্তনে বিলীন হয়ে বর্তমানে মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহে রূপ নিয়েছে।
এত ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে প্রাচীন এই স্থাপনাটি দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। তাদের জোর দাবি—অবিলম্বে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদ সংরক্ষণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শেকড় ও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে।
তরফ কামালের এই তিন গম্বুজ জামে মসজিদ আজও নীরবে বহন করে চলেছে শতাব্দীর সাক্ষ্য—যেখানে ইতিহাস, বিশ্বাস ও রহস্য মিলেমিশে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ঐতিহ্যের ধারা।
সাদুল্লাপুরে ৫০০ বছরের প্রাচীন তিন গম্বুজ জামে মসজিদ অবহেলায় হারাচ্ছে ইতিহাসের অমূল্য নিদর্শন




























