
গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত পাঠকনন্দিত দৈনিক দৃষ্টিপাত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, প্রকাশক ও সম্পাদক এবং জেলার সংবাদপত্র জগতের ‘রাখাল রাজা’ খ্যাত জি এম নূর ইসলাম আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে রাজধানী ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছরের কাছাকাছি।তাঁর মৃত্যুর খবর সাতক্ষীরায় পৌঁছালে সাংবাদিক, সংবাদকর্মী, পাঠক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ীরা শোক প্রকাশ করেন।দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন জি এম নূর ইসলাম। সম্প্রতি সাতক্ষীরার একটি হাসপাতালে তাঁর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ঢাকার একাধিক হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অধীনে তাঁর চিকিৎসা চলে।শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া গ্রামে ১৯৫০-এর দশকে জন্ম নেওয়া জি এম নূর ইসলাম সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নিজস্ব কর্মদক্ষতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একটি অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। একসময় ভিউকার্ড বিক্রির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করা নূর ইসলাম পরবর্তীতে সংবাদপত্র প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর হাত ধরেই ২০০১ সালে সাতক্ষীরা থেকে প্রথম অফসেট মুদ্রণে প্রকাশিত হয় দৈনিক দৃষ্টিপাত।একঝাঁক নবীন ও প্রবীণ সংবাদকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পত্রিকাটিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় দৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পাঠকের কাছে পত্রিকাটির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার বিকাশে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতিতে তিনি অটল ছিলেন। নীতি ও বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে আপস না করায় বিভিন্ন সময়ে তাঁর ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধসহ বিভিন্নভাবে দৃষ্টিপাতের প্রকাশনা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি তাঁর, পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সাংবাদিকতার নীতি ও সত্য প্রকাশের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।সাংবাদিকতার পাশাপাশি জি এম নূর ইসলাম বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং সাতক্ষীরার দৃষ্টিনন্দন মসজিদে কুবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। এছাড়া জাতীয় পত্রিকার পরিবেশক এবং ‘দৃষ্টি’ ড্রিংকিং ওয়াটারের উৎপাদক হিসেবেও তিনি পরিচিতি অর্জন করেন।শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুর ২টায় সাতক্ষীরা সিটি কলেজ সংলগ্ন দারুল উলুম মাদ্রাসার মাঠে জি এম নূর ইসলামের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে সেখানে আয়োজিত শোকসভায় তাঁর কর্মময় জীবন ও সাংবাদিকতায় অবদানের কথা স্মরণ করে বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপি নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল, জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আশরাফুজ্জামান আশু, বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবরা, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু জাহিদ ডাবলু, সাতক্ষীরা নগর উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক কারুক হোসেনসহ স্থানীয় সাংবাদিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।বক্তারা বলেন, জি এম নূর ইসলাম ছিলেন সাতক্ষীরার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা জগতের একজন প্রবীণ, নিবেদিতপ্রাণ ও সাহসী ব্যক্তিত্ব। স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রসার এবং সাংবাদিকতার বিকাশে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে সাতক্ষীরার সংবাদপত্র জগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।পরে স্থানীয় মসজিদের ইমামের ইমামতিতে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজায় অংশ নেওয়া মুসল্লিরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।মৃত্যুকালে জি এম নূর ইসলাম অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে সাতক্ষীরার সাংবাদিক সমাজ, সংবাদপত্রসেবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে গভীর শোক বিরাজ করছে।





























