
আরাফাত আলী,স্টাফ রিপোর্টার:
সাতক্ষীরার পশ্চিম সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে জেলেদের অনুমতিপত্র (বিএলসি) দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে শ্যামনগরের চারটি বন স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী, কোবাদক ও কদমতলা ফরেস্ট স্টেশনে বিএলসি পাসের নামে প্রতি সপ্তাহে জেলেদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
জেলেদের অভিযোগ, সরকারি রাজস্ব ও নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও বিএলসি পাসের জন্য নৌকা ও জেলেপ্রতি অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে পাস পেতে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। ফলে বাধ্য হয়ে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বিএলসি নিতে হচ্ছে তাদের।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসের পর মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য ৯৩২ জন জেলে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করে নদীতে যাওয়ার অনুমতি হিসেবে বিএলসি নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব বিএলসির বিপরীতে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে নৌকাপ্রতি প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৮'শ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কাঁকড়া আহরণকারী জেলে জানান, তিনজন জেলে একটি নৌকায় কাঁকড়া আহরণে গেলে জনপ্রতি ৩৫০ টাকা হিসেবে মোট ১ হাজার ৫০ টাকা দিতে হয়। দুইজন গেলে দিতে হয় ৭০০ টাকা। এর পাশাপাশি নৌকা অনুমোদনের জন্য দিতে হয় আরও ৪৫০ টাকা। আবার প্রতি সপ্তাহে পাস হস্তান্তরের সময় বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসের স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিনকে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫'শ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ তাদের।
জেলেদের ভাষ্য, সরকারি নির্ধারিত ফি আলাদাভাবে পরিশোধের পরও এ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। ফলে একটি নৌকা সুন্দরবনে নিয়ে গিয়ে মাছ বা কাঁকড়া আহরণ করতে তাদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, মাছ আহরণকারী কয়েকজন জেলে অভিযোগ করেন, মাছের নৌকায় থাকা প্রত্যেক জেলের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। একটি মাছ ধরার নৌকায় সাধারণত চার থেকে ছয়জন জেলে থাকেন। সে হিসাবে নৌকাপ্রতি ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এর সঙ্গে নৌকাপ্রতি বিএলসির জন্য আরও ৪৫০ টাকা দিতে হয়।
জেলেরা জানান, কাঁকড়া আহরণের নৌকার জন্য সরকারি নির্ধারিত ফি ৭০ টাকা, জনপ্রতি প্রবেশ ফি ১৫ টাকা এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। কাঁকড়ার নৌকার জন্য প্রবেশ ফি ১২ টাকা করেও নির্ধারিত রয়েছে বলে তারা জানান। তবে অভিযোগ, এসব সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। আর অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের টাকা যাচ্ছে কর্মকর্তাদের পকেটে।
জেলেদের অভিযোগ, বিএলসির টাকা সরাসরি তাদের কাছ থেকে গ্রহণ না করে স্থানীয় কয়েকজন দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিনের হয়ে এসব দালাল জেলেদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
জেলেদের অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজনের নামও উঠে এসেছে। তারা হলেন,শহিদুল মোল্লা, জালাল মোল্লা, হাসান, কান শহিদুল, আসাদুল ও ইসমাইল সানা।
জেলেদের ভাষ্য, নিজেরা সরাসরি বিএলসি নিতে গেলে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। ফলে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে বিএলসি নেওয়াই তাদের জন্য সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে দাবি করেন, চলতি মৌসুমে শুধু বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকেই অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায় হতে পারে।
জেলেদের অভিযোগ, বুড়িগোয়ালিনী ছাড়াও কৈখালী, কোবাদক ও কদমতলা ফরেস্ট স্টেশনেও একই ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা রয়েছে। চারটি বন স্টেশনে মিলিয়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় অর্ধকোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
অভিযোগের বিষয়ে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসের স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন বলেন, আমি সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে কোনো টাকা গ্রহণ করিনি।
অতিরিক্ত টাকা আদায় ও দালালের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সাতক্ষীরা বন বিভাগের এসিএফ শাহিনুর ইসলাম বলেন, বন বিভাগে কারা দালালি করেন, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া স্টেশন কর্মকর্তারা অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে অভিযোগটি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।জেলেরা যদি কোনো স্টেশন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করে তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলেদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সরকারি নির্ধারিত ফি ও বাস্তবে আদায় করা অর্থের মধ্যে পার্থক্য খতিয়ে দেখা এবং বিএলসি প্রদান প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




























