
মোঃ কাওছার আহম্মেদ, গাইবান্ধা ঃ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করা গেল না চরবাসীর একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাধিকবার পরিদর্শন, স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস এবং সর্বশেষ ৮ আগস্ট পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের পরিদর্শনের পরও বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে তীব্র ভাঙনে বিদ্যালয়ের একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন বিদ্যালয়ের আসবাব ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে বিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিদ্যালয়ের একটি বেড়া ও তিনটি জানালা ইতোমধ্যে নদীতে চলে গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৪ জন শ্রমিক বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি চরাঞ্চলের মানুষের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নদীভাঙনে আশপাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন তাঁরা। ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যালয় রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ৮ আগস্ট পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তাঁর পরিদর্শনের পর স্থানীয়দের মধ্যে বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। তবে সেই আশাও শেষ পর্যন্ত হতাশায় পরিণত হয়েছে। কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘টিও, এটিও, ইউএনও, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ডিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। নতুন করে যেন আর কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তাঁরা। বিশেষ করে চরবাসীর একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে আজকের এই করুণ দৃশ্য দেখতে হতো না। এর দায় কেউ এড়াতে পারবেন না।’ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গতকালও স্কুলে ক্লাস হয়েছে। ভোরে শুনলাম এই অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে এটিও স্যারকে জানাই। তিনি এসেছেন। পরামর্শ করে ১৪ জন শ্রমিক লাগিয়ে দিয়েছি। তারা বিদ্যালয়ের জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। এরই মধ্যে একটি বেড়া ও তিনটি জানালা নদীতে চলে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রী, এমপি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ডিসি ও ইউএনও স্যার সবাই এসেছিলেন। শুধু আশ্বাসই পেয়েছি। স্কুল এলাকায় একটি জিও ব্যাগও ফেলানো হয়নি। ফেললে হয়তো আজকের এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে হতো না।’ ঘটনাস্থল থেকে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘নদীভাঙন শুরুর পর থেকে যখন যা হয়েছে, বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। সে কারণেই আজ এই ভয়াবহ অবস্থা।’ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘নতুন করে আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। বিষয়টি শুনেছি। প্রতিষ্ঠানটি অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ নদীভাঙন ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নদীভাঙনের বিষয়ে কারও কোনো হাত নেই। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো গাফিলতি আছে কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আশা করি, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।’ তবে এর আগে স্কুল এলাকায় কোনো জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘গত বছর ওই স্কুলের আপ ও ডাউনে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। তবে এবার ওই স্কুল রক্ষায় কোনো জিও ব্যাগ বরাদ্দ হয়নি।’ এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে একের পর এক পরিদর্শন আর আশ্বাসের পরও চরবাসীর একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নদীর গ্রাস থেকে রক্ষা করা গেল না। এখন বিদ্যালয় রক্ষার বদলে চলছে তার স্মৃতি ও সামগ্রী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি।




























