
কবির হোসেন
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে দীর্ঘ আট মাস ওষুধের সরবরাহ বন্ধ। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার এই কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত পর্যাপ্ত ওষুধ না আসায় রোগীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
৩১৮.১৩ বর্গ কিলোমিটারের আয়তনের এই উপজেলায় ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌর সভা নিয়ে গঠিত। ২০২২ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী মোট পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৭৬ হাজার ৪১৪টি এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ ৪ হাজার ১৭৪জন রয়েছে। এর বিপরীতে উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ৩৩টি, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ৩টি ও পরিবার পরিকল্পনার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ৪টি। প্রতিটি কমিউনিটি
ক্লিনিকের রেজিস্ট্রার খাতা অনুযায়ী প্রতি ক্লিনিকে গড়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতো ৬০ থেকে ৭০ জন। উপজেলায় ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন প্রায় ২হাজারেরও বেশি রোগীকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিলো। কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। দীর্ঘদিন ওষুধ না থাকায় সাধারণ মানুষ সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে।
প্রান্তিক অসচ্ছল মানুষেরা এখানে জ্বর, সর্দি, কাশি এবং ছোটখাটো চিকিৎসার জন্য এইসব ক্লিনিকে আসতো বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ নিতে। এ ছাড়া জেলা বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গুলোতে রোগীর চাপ কমানোর একটা বড় মাধ্যম ছিলো এই কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো।
বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহিরাগত বিভাগে প্রতিদিনই ৫/৬শ রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিচ্ছে। উপজেলার গ্রামীণ জনপদ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে আসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার দিন দিন বাড়ছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তী রোগীর সংখ্যা। আগে যেখানে কমিউনিটি ক্লিনিক গুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসায় জ্বর, সর্দি, কাশিসহ ছোট-খাটো অসুখ নির্মূল হতো এখন সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধের অভাবে টাইফয়েডসহ নানা অসুখের প্রাদুর্ভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তী হচ্ছে অসংখ্য রোগী। যা শয্যার চেয়ে বেশি। তাই প্রায় দেখা যায় ভর্তী রোগীর সিট সংকটের কারণে জায়গা হচ্ছে মেঝেতে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা যায়, এখানে পার্শ্ববর্তী নিয়াতপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার তাদের শূন্য রেখা থেকে গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাছে হওয়ায় অনেক রোগীই এখানে চিকিৎসা নিতে আসে।
এদিকে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে গর্ভনিরোধক ইনজেকশন পর্যাপ্ত থাকলেও সুখী বড়ি ও কনডমের
তীব্র সংকট। এর ফলে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ ও মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পরবর্তী ইউনিয়নের কাঁশরইল গ্রামের ৩৩বছর বয়সী শ্রী অলোকা রাণী বলেন, আমার জ্বর ও সর্দি কাশি হয়েছে। আমি কাঁশরইল কমিউনিটি ক্লিনিকে গেছিলাম চিকিৎসা ও ওষুধ আনতে। কিন্তু ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে কোন ওষুধ পাই নি। আমার এখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। এখন এই অবস্থায় কারো কাছে ধার দেনা করে ওষুধ কিনতে হবে।
রহনপুর ইউনিয়নের পূনর চাঁদপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের হেল্থ কেয়ার প্রভাইডার মো. মোহাইমেনুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ দিন যাবত আমাদের ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ নেই। আগে প্রতিদিনই গর্ভবতী, শিশু ও সাধারণ রোগী মিলিয়ে প্রায় ৬০/৭০ জন রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিতো। এখন ওষুধ সরবরাহ না থাকার কারণে কোন রোগীই আর আসে না।
উপজেলা সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন জানান, উপজেলায় বেশ কিছু দিন যাবত সুখী বড়ি ও কনডম সরবরাহ নেই। তবে আমাদের ৪টি উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র চাহিদার তুলনায় খুবই অল্প পরিমান সুখী বড়ি ও কনডম রয়েছে তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ গর্ভনিরোধক ইনজেকশন রয়েছে। তবে আশা করছি অতি শীঘ্রই এই সংকট কেটে যাবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আব্দুল হামিদ জানান, আমাদের ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকে সর্ব শেষ ওষুধ দিয়েছি ২০ আগস্ট ২০২৫ সালে এর পর এখন পর্যন্ত আর কোন ওষুধ সরবরাহ দিতে পারি নি। তবে হেল্থ কেয়ার প্রভাইডারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত উপস্থিত থেকে স্বাস্থ্য সেবা দেয়।





























