
শাহিন মিয়া, বিশেষ প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার ঐতিহাসিক কুতুব শাহী মসজিদ ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। শতাব্দীপ্রাচীন এই মসজিদ দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। তবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনায় পর্যটকদের জন্য শৌচাগারের সুব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তির বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রাচীন স্থাপত্যের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মৌলিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
পাঁচ গম্বুজের মসজিদে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া
মসজিদের সামনে স্থাপিত তথ্যফলক অনুযায়ী কুতুব শাহী মসজিদ কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম থানা সদরে অবস্থিত। পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদে বাংলার সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যরীতির বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এর নির্মাণশৈলী কারুকার্য এবং ঐতিহাসিক পটভূমি মসজিদটিকে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার মর্যাদা দিয়েছে।
মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তথ্যফলকে উল্লেখ করা হয়েছে কেউ কেউ এটিকে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বলে মনে করলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিকের ধারণা এটি সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নির্মিত হওয়ার ধারণাটিও ফলকে তুলে ধরা হয়েছে। বিখ্যাত দরবেশ কুতুব শাহের নামানুসারে এই মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে। মসজিদের পাশেই তাঁর কবর অবস্থিত বলেও ফলকে উল্লেখ রয়েছে। ফলে স্থাপনাটি ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
স্থাপত্যশৈলীতে রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য
তথ্যফলকে দেওয়া পরিমাপ অনুযায়ী মসজিদটির উত্তর দক্ষিণে দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ ফুট ১১ ইঞ্চি এবং পূর্ব পশ্চিমে প্রস্থ প্রায় ২৭ ফুট ১১ ইঞ্চি। মসজিদটির কার্নিশ বাংলার ঐতিহ্যবাহী চৌচালা ঘরের কার্নিশের তুলনায় বেশি বাঁকানো। চার কোণে রয়েছে অষ্টকোণবিশিষ্ট চারটি মিনার বা কর্নার টারেট। বাইরের দেয়ালে প্যানেলিংয়ের কারুকার্য রয়েছে। পূর্ব দেয়ালে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে মোট সাতটি প্রবেশপথ রয়েছে বলে তথ্যফলকে উল্লেখ করা হয়েছে। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব।
এসব স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য মসজিদটির নির্মাণশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরে। ১৯০৯ সালে সরকার কুতুব শাহী মসজিদকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনা সংরক্ষণ এর পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর ইতিহাস তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটকদের জন্য নেই শৌচাগারের সুব্যবস্থা
ঐতিহাসিক কুতুব শাহী মসজিদ দেখতে আসা পর্যটকদের জন্য প্রস্রাব পায়খানার পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানে দর্শনার্থীদের মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি হলেও এ ক্ষেত্রে শৌচাগারের সুব্যবস্থার অভাব ভোগান্তির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে নারী শিশু বয়স্ক ব্যক্তি এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কোনো দর্শনীয় স্থানে এসে এ ধরনের মৌলিক সুবিধা না পেলে দর্শনার্থীদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এ ছাড়া পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনার আশপাশের পরিবেশ সুরক্ষায় পরিকল্পিত শৌচাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কার্যকর উদ্যোগের দাবি
অষ্টগ্রামের ঐতিহাসিক কুতুব শাহী মসজিদকে ঘিরে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঐতিহাসিক স্থাপনার পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। এ অবস্থায় মসজিদ প্রাঙ্গণ বা উপযুক্ত নিকটবর্তী স্থানে স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট নির্মাণ নিরাপদ পানির ব্যবস্থা বসার স্থান এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একই সঙ্গে মসজিদের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও পরিবেশের ক্ষতি না করে পর্যটকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এতে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি কমবে এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনটির প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে। কুতুব শাহী মসজিদ অষ্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শুধু অতীতের স্মৃতি বহন করে না বরং নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও স্থাপত্য সম্পর্কে জানার সুযোগও করে দেয়। তাই ঐতিহাসিক মসজিদটির যথাযথ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি অষ্টগ্রামের পর্যটন বিকাশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।




























