
ওবাইদুল চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি:
দুই প্রান্তে ভাঙা সড়ক, নিচে খরস্রোতা চাঁনখালী খাল। সেতুতে ওঠার পথটুকুও নেই কোথাও। কোথাও বাঁশের সাঁকো বেয়ে, কোথাও ভাঙা অংশ ধরে উঠতে হয় নড়বড়ে সেতুতে। এভাবেই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন আনোয়ারা ও পটিয়া উপজেলার হাজারো মানুষ। শতবর্ষী টাঙ্গাপুল সেতুটি এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের নাম।
স্কুলশিক্ষার্থী থেকে কৃষক, রোগী থেকে ব্যবসায়ী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এই সেতু। অথচ সেতুটির এমন বেহাল দশা যে ভারী যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, মোটরসাইকেল নিয়েও পার হওয়া কঠিন। বর্ষায় খালে পানির প্রবাহ বাড়লে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, চাঁনখালী খালের এক পাশে পটিয়া উপজেলার আশিয়া ইউনিয়ন, অন্য পাশে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়ন। মাঝখানে খরস্রোতা খালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রায় একশ বছরের পুরোনো টাঙ্গাপুল সেতু। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেতুটির দুই প্রান্তের সংযোগ সড়কের বড় অংশ ভেঙে খালে বিলীন হয়েছে। কোথাও বাঁশের সাঁকো, কোথাও জোড়াতালি দিয়ে তৈরি হয়েছে পারাপারের ব্যবস্থা। সেতুর বিভিন্ন অংশও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতুর পশ্চিম প্রান্তে আনোয়ারার পরৈকোড়া ইউনিয়নের মাহাতা, দীঘিরপাড়সহ কয়েকটি গ্রাম। পূর্ব প্রান্তে পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়নের বাথুয়া এলাকা। দুই প্রান্তেই রয়েছে সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং বাজার। ফলে সেতুটি শুধু দুই উপজেলার সংযোগ নয়, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আগে কৃষিপণ্য ও বিভিন্ন মালামাল সহজে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নেওয়া গেলেও এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষকদের পণ্য নিয়ে বিকল্প পথে ঘুরে হাটবাজারে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে সময় ও পরিবহন খরচ। জরুরি রোগী পরিবহনেও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্থানীয়দের।
পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো:ইদ্রিস মিয়া বলেন, টাঙ্গাপুল সেতুটি উন্নত হলে পটিয়া ও আনোয়ারার মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। বর্তমানে সেতুটির কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। নতুন সেতু নির্মাণ হলে এ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
এদিকে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। চাঁনখালী খালে পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে গেলে ভাঙা সংযোগ অংশ দিয়ে পারাপার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।তবে সেতুটি নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাব পাঠানোর আগে একটি বিশেষজ্ঞ দল সরেজমিনে সেতুর স্থান পরিদর্শন করেছে। এ সময় সেতুর অবস্থান, সংযোগ সড়ক, আশপাশের যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব এবং নতুন সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়।
পটিয়া উপজেলা প্রকৌশলী তন্ময় নাথ বলেন, চাঁনখালী খালের ওপর অবস্থিত শতবর্ষী টাঙ্গাপুল সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে উপজেলা ও গ্রাম সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) আওতায় সেতুটি ডিপিপিভুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। ডিপিপি অনুমোদন হলে দ্রুত সেতুটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত সেতু নির্মাণের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ হয়নি। অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছি।
দুই উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগের ভরসা টাঙ্গাপুল সেতু। কিন্তু সেই ভরসাই এখন প্রতিদিনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে না থেকে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বন্ধ হবে বাঁশের সাঁকো বেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপারের দুর্ভোগ।





























