
মাসুম বিল্লাহ রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি একদিকে দেশের স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়নের নানা সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীর বাস্তবতা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও আধুনিক চিকিৎসাসেবার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ। দেশের ৫০২টি উপজেলার মধ্যে একমাত্র রাঙ্গাবালী উপজেলায় এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল নেই। জেলা সদর পটুয়াখালী থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে নদীবেষ্টিত এ দ্বীপ উপজেলার মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা সীমিত স্বাস্থ্যসেবা। পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল না থাকায় অসুস্থ হলেই অনেকের প্রথম ভরসা গ্রাম্য চিকিৎসক কিংবা হাতুড়ে ডাক্তার। আর রোগ জটিল হলে শুরু হয় নদী পাড়ি দিয়ে জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম। এমন বাস্তবতায় প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন হাসপাতালটির কাজও প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকায় চরম হতাশা বিরাজ করছে স্থানীয়দের মধ্যে।চারদিকে নদী বেষ্টিত ৩৪৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাঙ্গাবালী উপজেলায় নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল। সীমিত স্বাস্থ্যসেবা থাকলেও জটিল রোগের চিকিৎসা সম্ভব নয়। ফলে প্রসব ব্যথা, হৃদরোগ, স্ট্রোক, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্য যেকোনো গুরুতর অসুস্থতায় রোগীদের নদীপথে, গলাচিপা অথবা পটুয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালে ছুটতে হয়। বৈরী আবহাওয়া কিংবা নৌযান সংকটে অনেক সময় চিকিৎসা পেতেই বিলম্ব হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন গর্ভবতী নারী, নবজাতক শিশু ও বয়স্ক রোগীরা।স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের এ দুর্ভোগ লাঘবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর উপজেলার পাঁচ একর জমির ওপর চারতলা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে পৃথক দুটি লটে প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে 'মেসার্স একেএপিসিএমএই জয়েন্ট ভেঞ্চার' প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শুরু করে। এক বছর মেয়াদি প্রকল্পের প্রথম লটের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় লটের প্রায় ৫৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়। হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় তিন বছর পার হলেও প্রকল্পটি এখনো অসমাপ্ত।কিন্তু ২০২৪ সালের জুন মাসে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় দুই বছর কেটে গেলেও হাসপাতালটি এখনো চালুর মুখ দেখেনি।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন হাসপাতাল ভবনটি এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত। যে ভবনে একদিন আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন গরু-ছাগলের বিচরণ। ভবনের দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর ভবনটিকে ঘিরে মাদকসেবীদের আনাগোনাও দেখা যায়। চিকিৎসাসেবার আশার প্রতীক হয়ে ওঠার কথা থাকলেও ভবনটি এখন অবহেলার নীরব সাক্ষী।রাঙ্গাবালীর এক উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল চিকিৎসক ডা. ফিরোজ মাহমুদ বলেন, রাঙ্গাবালী এমন একটি উপজেলা, যেখানে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল নেই। হাসপাতাল না থাকায় আমরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সব ধরনের রোগীর চিকিৎসা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বিশেষ করে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী, গর্ভবতী মা এবং অন্যান্য সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত অন্য উপজেলায় পাঠাতে হয়। অনেক সময় নদীপথে নেওয়ার আগেই রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ে। আবার নদী উত্তাল থাকলে স্পিডবোট বা ট্রলারও চলাচল করতে পারে না। তখন রোগী ও স্বজনদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। তাই রাঙ্গাবালীর মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন।স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, অসুস্থ হলে প্রথমে গ্রাম্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। রোগের অবস্থা গুরুতর হলে নদীপথে অন্য উপজেলায় নিতে হয়। অনেক সময় নৌযান না পাওয়ায় কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। তাদের ভাষ্য, দেশের উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই দ্বীপ উপজেলার স্বাস্থ্যসেবার তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। কোনো রোগী অসুস্থ হলে, বিশেষ করে বয়স্ক রোগী, গর্ভবতী মা ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য কাদা-মাটির পথ পেরিয়ে বিশাল নদী অতিক্রম করে অন্য উপজেলায় যেতে হয়। অনেক সময় রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মাঝনদীতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে বলে তারা দাবি করেন। এছাড়া রাত হলে কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় লঞ্চ, খেয়া বা স্পিডবোট—কোনোটিই পাওয়া যায় না। তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, আর সেই অপেক্ষাই অনেক সময় রোগীর জন্য মৃত্যুঝুঁকি ডেকে আনে। তাই দ্রুত রাঙ্গাবালী ৫০ শয্যা হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ করে কার্যক্রম চালুর দাবি জানান স্থানীয়রা। তাদের মতে, হাসপাতালটি চালু হলে উপজেলার সাধারণ মানুষ সময়মতো চিকিৎসাসেবা পাবে এবং জীবন বাঁচাতে নদী পাড়ি দেওয়ার দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে।এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, রাঙ্গাবালী হাসপাতাল নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করতে পৃথক দুটি লটে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি।পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, ২০২৪ সালে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়ায় রাঙ্গাবালী হাসপাতাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রকল্পটির ডিপিপি নতুন করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। এরপর, ইনশাআল্লাহ, হাসপাতালের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হবে।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ করে চালু করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাঙ্গাবালীর প্রায় দুই লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবার সংকট অনেকটাই দূর হবে। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য জীবন হাতে নিয়ে নদী পাড়ি দেওয়ার দুর্ভোগ থেকেও মুক্তি মিলবে।




























