
মোঃ কাওছার আহম্মেদ, গাইবান্ধা ঃ গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের উত্তর ধানঘড়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তা হোসনে আরা বেগম স্থানীয় পিছিয়ে পড়া, অসহায় ও আর্থিকভাবে দুর্বল নারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসার পর নারীদের কর্মমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। হোসনে আরা উত্তর ধানঘড়া গ্রামের মৃত হাফিজার রহমানের মেয়ে। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় তাঁর পড়াশোনা শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে সংসারজীবনে তিনি তিন কন্যাসন্তানের মা হন। তিন মেয়ে হওয়ার পর স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক জীবনে বিভিন্ন টানাপোড়েন তৈরি হয় বলে জানান তিনি। এরপর সন্তানদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের কাজের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। হোসনে আরা বলেন, নিজের জীবনে লেখাপড়া শেষ করার সুযোগ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে নারীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে আগ্রহী করেছে। তাঁর মতে, নারীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ দেওয়া গেলে তাঁরা পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখতে পারেন। নারীদের কর্মমুখী করতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন হোসনে আরা। তাঁর উদ্যোগে ও সহযোগিতায় নারীদের সেলাই ও পোশাক তৈরি, বুটিকের কাজ, নকশিকাঁথা, হস্তশিল্প ও কারুশিল্প, বিউটি কেয়ার, পিঠা ও ঘরোয়া খাবার তৈরি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু পালন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনাসহ বিভিন্ন আয়মুখী কাজের বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের একটি নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি তাঁদের উৎপাদিত পণ্য কীভাবে ব্যবহার ও বাজারজাত করা যায়, সে বিষয়েও সচেতন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। হোসনে আরার ভাষ্য, অনেক নারী কাজ করতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও বাজারসংযোগের অভাবে নিয়মিত আয় করতে পারেন না। তাই শুধু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাই নয়, প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের কাজের সঙ্গে যুক্ত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার দরিদ্র, অসহায়, বঞ্চিত এবং পারিবারিক নানা সমস্যার মধ্যে থাকা নারীদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে হোসনে আরার। তাঁর মতে, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে তাঁদের নিজেদের অবস্থানের পাশাপাশি পরিবারেরও পরিবর্তন ঘটতে পারে। তিনি বলেন, অনেক নারী ঘরে বসে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে সক্ষম। তাঁদের প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সহযোগিতা ও কাজের সুযোগ। এসব সুযোগ তৈরি করা গেলে নারীরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারবেন। হোসনে আরার লক্ষ্য হলো, স্থানীয় নারীদের ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। ঘরে বসে সেলাই, হস্তশিল্প, খাদ্যপণ্য তৈরি বা অন্যান্য কাজের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ তৈরি হলে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। হোসনে আরার নিজের জীবনও সহজ ছিল না। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরবর্তীতে তিন সন্তানকে নিয়ে পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান তিনি। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মনে করেন, নারীদের নিজের দক্ষতা ও আয়ের পথ তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, কোনো কারণে পারিবারিক জীবনে সমস্যা দেখা দিলে একজন নারী যেন সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল না থাকেন—সেজন্য কর্মদক্ষতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর উদ্যোগকে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। স্থানীয় পর্যায়ে আরও বেশি নারীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। হোসনে আরা মনে করেন, প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। একটি কাজ শেখার পর সেই কাজ থেকে কীভাবে আয় করা যায়, সেটিও নারীদের জানানো প্রয়োজন। সেলাই শেখা একজন নারী ঘরে বসে পোশাক তৈরি করতে পারেন। হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ নেওয়া নারী নিজের তৈরি পণ্য বিক্রি করতে পারেন। খাদ্য তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ অর্ডারভিত্তিক কাজ করতে পারেন। আবার হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে কেউ ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এ ধরনের ছোট উদ্যোগগুলোকে ধীরে ধীরে বড় করার বিষয়ে নারীদের উৎসাহিত করছেন হোসনে আরা। হোসনে আরার সঙ্গে কাজ করা বা তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের প্রকৃত বক্তব্য যুক্ত করা হলে তাঁর উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। একজন প্রশিক্ষণার্থী বলেন “প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা নতুন কাজ শিখছি। আগে নিজেরা কী করতে পারি, সে বিষয়ে ধারণা কম ছিল। এখন কাজ শেখার পাশাপাশি নিজের আয় করার বিষয়েও চিন্তা করছি। আরেকজন বলেন, “শুধু প্রশিক্ষণ নয়, প্রশিক্ষণের পর কাজের সুযোগ ও পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা হলে আমরা আরও বেশি উপকৃত হব। ভবিষ্যতে নারীদের জন্য প্রশিক্ষণের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি করতে চান হোসনে আরা। স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করার বিষয়েও কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তাঁর। তিনি চান, উত্তর ধানঘড়া ও আশপাশের এলাকার নারীরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ছোট পরিসরে হলেও আয়মুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হোক। তাঁর মতে, একজন নারীকে দক্ষ করে তোলা হলে তিনি নিজের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সহযোগিতা করতে পারেন। বিশেষ করে সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে নারীর নিজস্ব আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হোসনে আরা বেগমের জীবন ও উদ্যোগ একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং নারী উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি গল্প। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে তাঁর পড়াশোনা শেষ হয়নি। পরবর্তীতে তিন কন্যাসন্তানকে নিয়ে পারিবারিক জীবনের নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসে তিনি এখন অন্য নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করার চেষ্টা করছেন। তাঁর উদ্যোগ এখনো স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত। তবে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং বাজারসংযোগ এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।




























