
বিদেশের মাটিতে জীবিকার সন্ধানে গিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব থেকে ফিরতে হয়েছিল শূন্য হাতে। সেই হতাশা আর অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে এখন তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। শুধু নিজের জীবিকাই গড়ে তোলেননি, বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও ছয় নারীকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছেন টাঙ্গাইলের বেদেনা আক্তার। তাঁর এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে এবার ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ৯০ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান দিয়েছে ব্র্যাক।
বিদেশফেরত নারীদের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেদেনা আক্তারের এই সাফল্যকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছে ব্র্যাক। সংস্থাটির মাইগ্রেশন কর্মসূচি বলছে, বিদেশফেরত কর্মীদের পুনরেকত্রীকরণ শুধু আর্থিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়; তাঁদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা ১১টায় টাঙ্গাইলের এমআরএসসি কার্যালয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচির ‘প্রত্যাশা-২’ প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত ‘নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশফেরতদের পুনরেকত্রীকরণ’ বিষয়ক সমন্বয় সভায় বেদেনা আক্তারের হাতে ৯০ হাজার টাকার অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হয়।
বেদেনা আক্তার টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বেলুয়াটিয়া এলাকার বাসিন্দা।
২০২২ সালের এপ্রিলে সৌদি আরব থেকে কোনো সঞ্চয় ছাড়াই দেশে ফিরতে হয় তাঁকে। বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরলেও সামনে কীভাবে জীবন চালাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন তিনি।
তবে থেমে থাকেননি বেদেনা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচির সহায়তায় পাওয়া ৮০ হাজার টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন ও প্রয়োজনীয় কাপড় কিনে শুরু করেন দর্জির ব্যবসা। ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়তে থাকে। নিজের পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসে তৈরি করেন আয়ের পথ।
একপর্যায়ে নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্য নারীদের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন তিনি। এ পর্যন্ত ছয় নারীকে বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বেদেনা। প্রশিক্ষণ নেওয়া নারীরা এখন নিজেরাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের উপার্জন পরিবারের আর্থিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে।
বেদেনার এই গল্প কেবল একজন বিদেশফেরত নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়; বরং একজনের উদ্যোগ কীভাবে অন্য নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, তারও উদাহরণ।
সমন্বয় সভায় নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, বিদেশফেরত কর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন এবং তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতিনিধি, বিডিসি (BDC), রেইজ (RAISE) প্রকল্পের কর্মকর্তা এবং ব্র্যাকের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির কর্মীরা অংশ নেন। বক্তারা অভিবাসন খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরেন।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক, বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) অধ্যক্ষ অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন।
সভায় উপস্থিত অতিথিরা বেদেনা আক্তারের উদ্যোগকে বিদেশফেরত কর্মীদের পুনরেকত্রীকরণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁরা বলেন, বিদেশফেরত কর্মীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাঁরা নিজেরাই অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন। একই সঙ্গে তাঁদের মাধ্যমে অন্যদের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে।
বেদেনা আক্তারের মতো নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি বিদেশফেরত নারীদের নতুন করে জীবন শুরু করার সম্ভাবনাও তুলে ধরে। বিদেশের কর্মজীবন শেষ হয়ে গেলেও দেশে ফিরে যে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলা যায়, বেদেনার পথচলা তারই প্রমাণ।




























