
জীবনের যেকোনো পরীক্ষাই চূড়ান্ত নয়, এটি শেখার একটি অবিরাম প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। সম্প্রতি প্রকাশিত ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকালে আমাদের মিশ্র অনুভূতির সম্মুখীন হতে হয়। একদিকে যেমন কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর নীরব কান্না। পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর প্রায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি বা অকৃতকার্য হয়েছে। পাসের হারের এই হিসাব-নিকাশের আড়ালে যে বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী হোঁচট খেল, তাদের এখন কী হবে? সমাজ ও পরিবার যখন তাদের দিকে সমালোচনার তির ছুঁড়তে ব্যস্ত, তখন এই হতাশাগ্রস্ত তরুণদের হাতটি ধরবে কে?
বয়ঃসন্ধিকালের এই নাজুক সময়ে একটি বড় ব্যর্থতা শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত করে তোলে। পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের কচি মনে জন্ম দেয় এক তীব্র হীনমন্যতার। এই সময়টাতে যদি তাদের সঠিকভাবে গাইড করা না হয়, যদি তাদের কাঁধে সহানুভূতির হাত রাখা না হয়, তবে তাদের বিপথগামী হওয়ার শতভাগ আশঙ্কা থাকে। হতাশা থেকে মাদকাসক্তি, কিশোর অপরাধ কিংবা আত্মহননের মতো ভয়ানক পথে পা বাড়ানো এই বয়সে খুবই স্বাভাবিক। একটি অকৃতকার্য ছেলে বা মেয়ে যখন চারপাশের পৃথিবীটাকে বৈরী ভাবতে শুরু করে, তখন অন্ধকার জগত তাদের খুব সহজেই প্রলুব্ধ করতে পারে। তাই এই চরম ক্রান্তিলগ্নে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক পরামর্শ এবং একটি নিরাপদ মানসিক আশ্রয়।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় এবং পবিত্র দায়িত্বটি পালন করতে পারেন আমাদের শিক্ষক সমাজ। একজন শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পুঁথিগত বিদ্যাই দান করেন না, তিনি একজন শিক্ষার্থীর মনোজগতের রূপকার, তার ভবিষ্যতের স্থপতি। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের এখন হতে হবে আগের চেয়ে অনেক বেশি সদয় ও সহানুভূতিশীল। মায়া-মমতা ও নিখাদ ভালোবাসা দিয়ে তাদের বোঝাতে হবে যে, একটি বোর্ডের পরীক্ষার ফল কখনো জীবনের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। টমাস আলভা এডিসন, আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে শুরু করে জ্যাক মা ইতিহাসের পাতায় এমন বহু উদাহরণ আছে, যারা প্রথাগত পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হয়েও পরবর্তীতে মেধা ও পরিশ্রমে পৃথিবীকে বদলে দিয়েছেন। শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো সেই অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণগুলো শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরে তাদের ভেঙে পড়া আত্মবিশ্বাস পুনরায় জাগিয়ে তোলা।
শিক্ষকদের এখন কিছু প্রায়োগিক পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, যারা ফেল করেছে, তাদের আলাদাভাবে সময় দিতে হবে। তিরস্কার বা ভর্ৎসনার বদলে তাদের ব্যর্থতার প্রকৃত কারণগুলো স্নেহের সাথে খুঁজে বের করতে হবে। কারো হয়তো নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে ভীতি আছে, কারো হয়তো পারিবারিক বা মানসিক সমস্যা ছিল, আবার কারো হয়তো পড়াশোনার পদ্ধতিতেই গলদ ছিল। এই কারণগুলো চিহ্নিত করে তাদের জন্য বিশেষ পাঠপরিকল্পনা তৈরি করা শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব। পাশাপশি, শিক্ষকদের কথা বলতে হবে অভিভাবকদের সাথেও। অনেক অভিভাবক লোকলজ্জার ভয়ে সন্তানদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করেন। শিক্ষকদের উচিত অভিভাবকদের বোঝানো, যাতে তাঁরা সন্তানদের এই বিপদের দিনে তাদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ান।
শিক্ষা কেবল জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা নয়; শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো একজন মানুষকে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যখন দেখবে তাদের চরম ব্যর্থতার দিনেও শিক্ষকরা তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি, পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছেন তখন তাদের মনে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেবে। শিক্ষকদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাদের ভেতরে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের বীজ বপন করবে। তারা শিখবে কীভাবে ব্যর্থতার ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন শক্তিতে উড়ে আসতে হয়। আগামী দিনে এরাই হয়তো দেশের সবচেয়ে সৎ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কারিগরি শিক্ষার প্রসার এখানে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। যারা সাধারণ শিক্ষায় বারবার হোঁচট খাচ্ছে, শিক্ষকদের উচিত তাদের কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্ভাবনার কথা জানানো। সবাই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে না, কেউ হয়তো দক্ষ টেকনিশিয়ান, কেউ মেকানিক বা কেউ সফল উদ্যোক্তা হবে। হাতের কাজ ও বাস্তবমুখী শিক্ষার মাধ্যমেও যে জীবনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা যায়, সেই পথটি শিক্ষকদেরই দেখাতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, ২০২৬ সালের এই এসএসসি পরীক্ষায় যারা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পায়নি, তারা কেউ ফেলনা নয়, তারা আমাদেরই সন্তান। তাদের এই সাময়িক ব্যর্থতার দায়ভার সমাজ, পরিবার বা শিক্ষাব্যবস্থা কেউই পুরোপুরি এড়াতে পারে না। তাই আসুন, দোষারোপের অসুস্থ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আমরা এই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াই। বিশেষ করে আমার সহকর্মী ও দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা শিক্ষক সমাজের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান আপনারা আপনাদের অসীম মমতা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই ঝরে পড়া ফুলগুলোকে পুনরায় প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ দিন। আপনাদের একটুখানি ভালোবাসা, একটি সঠিক দিকনির্দেশনা একটি সম্ভাবনাময় জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এবং সমাজকে উপহার দিতে পারে একজন আলোকিত সুনাগরিক।
লেখক: শেখ মোঃ রকিবুল ইসলাম, অধ্যক্ষ, বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল এ্যান্ড কলেজ
প্রধান পৃষ্ঠপোষক, এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন





































