
গত ৩০ এপ্রিল, বিকাল ৩টা। রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। নেই কোনো রাজনৈতিক ব্যস্ততা, নেই কর্মী-সমর্থকের ভিড়। গেটের সামনে দুজন কর্মী গল্পে মশগুল। আর ভেতরে কয়েকজন ব্যস্ত দুপুরের খাবারে।
নেতারা আছেন কি না জানতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী জানিয়েছেন, প্রোগ্রাম না থাকলে সকাল বা দুপুরে কেউ থাকেন না। সন্ধ্যার দিকে কিছু নেতাকর্মী আসেন। আর যেদিন চেয়ারম্যান অথবা মহাসচিব আসেন, সেদিন নেতাকর্মীর ভিড় বেশি থাকে।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে আবার কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ১০ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মী ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। ঘণ্টাখানেক পর রাত ৮টার দিকে সবাই চলে যেতে শুরু করেন যে যার গন্তব্যে। এর আগে কথা হয় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে।
রেজাউল ইসলাম বলছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আগুন দেওয়া হয়েছে দলীয় কার্যালয়ে। কয়েকবার মব-সন্ত্রাসও করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো আলোচনায় আমাদের ডাকা হয়নি। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। কিন্তু আমাদের প্রার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে। ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছে আমাদের হেভিওয়েট প্রার্থীদের। এসবের নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই তৃণমূল পর্যন্ত পড়েছে।’
জাতীয় পার্টির এক শীর্ষ নেতা বলছিলেন, নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক কাজ করছে। অনেকেই প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে চাইছেন না। কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও প্রত্যাশিত জমায়েত হচ্ছে না। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিকভাবে তারা একা হয়ে পড়েছেন।
দলের আরেক নেতা আরও হতাশার চিত্র তুলে ধরেন, ‘বর্তমানে জাতীয় পার্টি কার্যত ৯ ভাগে বিভক্ত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যারা দলকে ব্যবহার করে সুবিধা নিয়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ সম্প্রতি দল ছেড়ে চলে গেছেন। পাশাপাশি দলের অর্থনৈতিক অবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।’ তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পাশে দাঁড়াননি।
তবে এসব সংকট কাটিয়ে ওঠার আশা রেজাউল ইসলামের। তিনি বলেছেন, আমাদের সম্প্রতি বর্ধিত সভা হয়েছে। সেখানে এসব বিষয় খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। আমরা দল পুনর্গঠনের কাজ করছি। তিনি আরও জানান, দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের একটি অংশ আবার ফিরে আসতে চাইছেন। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না— জানতে চাইলে তার দাবি, ‘আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য পজিটিভ।’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাত ধরে জাতীয় পার্টির উত্থান। ১৯৯০ সালে তার পতনের পরও দলটি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কখনো আওয়ামী লীগের মিত্র, কখনো বিএনপি জোটের অংশ হয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে দলটি নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম আগামীর সময়কে বলছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতির কারণেই জাতীয় পার্টি আজ জনসমর্থন হারিয়ে সংকটে পড়েছে। জন্মলগ্ন থেকেই দলটির রাজনীতি ছিল গোষ্ঠীগত ও স্বার্থকেন্দ্রিক। একসময় বিএনপির সঙ্গে জোট করলেও পরে আবার সেখান থেকে সরে আসে। পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সরকারে থেকেও বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার চেষ্টা করে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
শামছুল আলম সেলিম দাবি করেন, ‘বর্তমানে জনগণের একটি বড় অংশ জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক পুনরুত্থান কঠিন হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলছিলেন, ‘সাম্প্রতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় পার্টির প্রকৃত জনসমর্থন যাচাইয়ের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে দলটি কার্যত প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।’
এই অধ্যাপক বলেন, ‘জাতীয় পার্টিকে তিনটি দিক থেকে জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া উচিত। প্রথমত, সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল; দ্বিতীয়ত, গত ১৭ বছরে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে কলুষিত করার অভিযোগ। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রায় ২৫ বছর বিভিন্নভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গে জাতীয় পার্টি জড়িত ছিল।’
আওয়ামী লীগ সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে একমাত্র জাতীয় পার্টিকে চিহ্নিত করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন রেজাউল ইসলাম। তার দাবি, গত দেড় দশকের বেশি সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, কিন্তু দায় চাপানো হচ্ছে শুধু জাতীয় পার্টির ওপর।
রেজাউল ইসলাম বলেন, আমরা তিনটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মূল বিরোধী দল অংশ নেয়নি এবং সে সময় দলের চেয়ারম্যান এরশাদকে কার্যত বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল অংশ নিয়েছিল। তখন বিএনপির সংসদ সদস্যরা চার বছর সাত মাস সংসদে ছিলেন। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর আমরা সংসদে ছিলাম মাত্র সাত মাস।
রেজাউল ইসলাম দাবি করেন, জাতীয় পার্টিও গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে এবং জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের আগামীর সময়কে বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টি সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে এবং জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ওপর চাপ, দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রসঙ্গে জি এম কাদের বলেছেন, ‘অতীতে এসব ঘটনায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল।’ তবে বর্তমানে সে ধরনের পরিস্থিতি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।







































