
আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, বোদা (পঞ্চগড়) প্রতিনিধি:
বাবা-মায়ের
ব্যাস্ততার কারনে ৪ বছরের শিশু সন্তানকে কিনে দেয়ে স্মার্টফোন, অনায়াসে
চালাতে পারে ইউটিউব কিডস। অথচ সে নিজের জুতোর ফিতা বাঁধতে জানে না। বর্তমান
যুগের শিক্ষার্থীরা বাংলার চেয়ে হিন্দিতে বেশি সাবলীল, কারণ রিলসের
নিরন্তর ঝড় তাকে সেদিকেই ঠেলে দিয়েছে।
বর্তমান
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একই অবস্থা শিক্ষক বোর্ডে সমীকরণ লিখে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
শ্রেণিকক্ষে সামনের সারিতেই কয়েক জন শিক্ষার্থী বারবার মোবাইলের দিকে
তাকাচ্ছে। কেউ ফেসবুকের নোটিফিকেশন চেক করছে, কেউ হোয়াটসঅ্যাপে রিপ্লাই
দিচ্ছে, আবার কেউ টিকটক স্ক্রল করতে করতে হাসি চেপে রাখছে। শিক্ষক বুঝতে
পারছেন, তিনি যা পড়াচ্ছেন তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে ঢুকছে না।
শেখার পরিবেশের জায়গা দখল করে নিচ্ছে মোবাইলের স্ক্রিন বা ‘পর্দার ফাঁদ’।
এ
দৃশ্য দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের চিত্র। শিক্ষার্থীদের
মধ্যে স্মার্টফোন, ট্যাব ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার বর্তমানে ‘নীরব
মহামারিতে’ রূপ নিয়েছে। প্রায় ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি সময় ডিজিটাল ডিভাইস
স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে
ব্যাহত করছে। আইসিডিডিআর,বির এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার শিশুরা বর্তমানে
গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। কারো ক্ষেত্রে এটি তিন ঘণ্টা, আবার
কারো ক্ষেত্রে আট থেকে ১০ ঘণ্টাও হচ্ছে।
বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, এক বছরের কম বয়সি শিশুদের কোনো
স্ক্রিন টাইম থাকা উচিত নয় এবং এক থেকে চার বছর বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে তা
দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বা তার কম হওয়া বাঞ্ছনীয়। এছাড়া ১৭ বছরের কম
বয়সিদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা স্ক্রিন টাইমের সুপারিশ করেছে
ডব্লিউএইচও। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া,
নরওয়েসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল
ডিভাইস আসক্তি থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। অথচ বাংলাদেশে এখনো তেমন কোনো
কার্যকর উদ্যোগ নেই। ‘শিশু আইন ২০১৩’-এ অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কোনো
নির্দিষ্ট বিধান নেই। ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ প্রাথমিকভাবে সাইবার
অপরাধ দমনে তৈরি, শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষায় নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ‘সাইবার
নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণীত হলেও এতে শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম
ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার কোনো বিধান নেই। তবে মাধ্যমিক ও
উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর এক অফিস আদেশে দশম
শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশে
নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু এটির বাস্তবায়নও কম।
অন্যদিকে
সাইবার বুলিং, আসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অনলাইনের নানা অপতত্পরতা
থেকে শিশুদের রক্ষা করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
কনটেন্ট মডারেশন বা সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে সরাসরি নির্দিষ্ট বয়সসীমার
শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার এক নতুন
বৈশ্বিক প্রবণতা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি এই তালিকায় সর্বশেষ দেশ হিসেবে
যুক্ত হয়েছে মালয়েশিয়া। অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মালয়েশিয়া সরকার। একই সঙ্গে সামাজিক
মাধ্যমগুলোকে বয়স যাচাই প্রক্রিয়া আরো কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবসহ ৮০ লাখের বেশি ব্যবহারকারী থাকা সব
প্ল্যাটফরম এই নিয়মের আওতায় আসবে। সাইবার সুরক্ষার জন্য গত সোমবার থেকে
নতুন আইনটি কার্যকর হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটি। কোনো প্ল্যাটফরম এই আইন
পালনে ব্যর্থ হলে তাদের ১ কোটি রিঙ্গিত জরিমানা দিতে হবে।
গত
২১ জুলাই ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার
নিষিদ্ধ করার আইন অনুমোদন করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। এর মাধ্যমে ইউরোপের
প্রথম দেশ হিসেবে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশে বয়সভিত্তিক
নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল ফ্রান্স। এর আগে গত ১৫ জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
স্যার কিয়ার স্টারমার ঘোষণা করেছেন, দেশটির ১৬ বছরের কম বয়সি শিশুরা টিকটক,
ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্স (সাবেক টুইটার)-এর
মতো বড় বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে না। তবে হোয়াটসঅ্যাপ
বা সিগনালের মতো মেসেজিং অ্যাপগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
প্রযুক্তি
প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকেই কম বয়সি ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট তৈরি করা
বন্ধ করতে এবং বিদ্যমান প্রোফাইলগুলো নিষ্ক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য দেশব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নজির গড়েছিল অস্ট্রেলিয়া।
গত মার্চে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নতুন কঠোর
বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে ব্রাজিল।
স্পেনের
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ দিতে ১৬
বছরের কম বয়সিদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৬
বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপে
চলতি বছরই একটি বিল উত্থাপন করবে নরওয়ে।
রাগের
প্রবণতা বাড়ছে :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন
অধ্যাপক বলেন, কান্না থামাতে, খাওয়াতে বা ব্যস্ত রাখতে আমরা শিশুর হাতে
তুলে দিচ্ছি ডিজিটাল ডিভাইস, যেমন মুঠোফোন, ট্যাব, টিভি।
বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে গেমিং ডিসঅর্ডারকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য
সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত
স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যেমন
মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, ঘুমের সমস্যা
দেখা দেয়, ভাষা ও শেখার বিকাশে দেরি হয়, সামাজিক দক্ষতা ও সহমর্মিতা কমে
যায় এবং উদ্বেগ ও রাগের প্রবণতা বাড়ে।
শিক্ষার্থীদের
ঘুম কেড়ে নিচ্ছে :বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার কোমলমতি শিশুরা এখন বড় ধরনের
ঝুঁকিতে। তাদের নিয়ে মা-বাবার চোখে-মুখে যে আশাজাগানিয়া স্বপ্নের বসবাস,
সেখানে এখন শঙ্কার কালো মেঘ। রাত জেগে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা
ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করা এখন দেশের কিশোর-কিশোরীদের একটি অংশের নিত্যদিনের
অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
গবেষণায়
দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি তাদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, পড়াশোনায়
মনোযোগ কমাচ্ছে, আর বাড়িয়ে দিচ্ছে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ। ‘নেচার অ্যান্ড
সায়েন্স অব স্লিপ’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক
পাশ করা ১ হাজার ১৩৯ শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির মাত্রা যত বাড়ে, ঘুমের মান ততই খারাপ হয়।
৮০
শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে :আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র
বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) জানিয়েছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ
ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে (মোবাইল, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটার) এবং গেমিং
ডিভাইসে সময় কাটাচ্ছে, যা তাদের ঘুম, শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের
ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংস্থাটির
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায়
এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে। এছাড়া অতিরিক্ত স্ক্রিন
ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, চোখের সমস্যা ও
মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতা বাড়ছে।
আসক্ত
ছেলেমেয়েরা বাস্তব জগৎ ছেড়ে এক কাল্পনিক ‘ফ্যান্টাসি’র মধ্যে বাস করছে
:সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রয়োগ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে লাগামহীন
‘স্ক্রিনটাইম’ বৃদ্ধি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক মানসিক ও
শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ‘যে
কোনো নেশার মতো ইন্টারনেট আসক্তিও মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে
মানুষের মনোযোগ ও স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়। অতিরিক্ত
স্ক্রিননির্ভরতার কারণে শিশুদের কল্পনাশক্তি লোপ পাচ্ছে। আসক্ত ছেলেমেয়েরা
বাস্তব জগৎ ছেড়ে এক কাল্পনিক ‘ফ্যান্টাসি’র মধ্যে বাস করছে।
এই
ব্যাধিতে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অন্ধকার ঘরে একা থাকা, ঠিকমতো
খাওয়াদাওয়া না করা, গোসল বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় অনীহার পাশাপাশি চোখের
‘ড্রাই আই’ রোগ দেখা দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে পারিবারিক
সম্পর্কে, সন্তানরা মা-বাবার কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
মাদকাসক্তির মতোই এই ‘ডিজিটাল আসক্তি’ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত্ বিকাশকে
বাধাগ্রস্ত করছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
অপরাধের
দিকেও ঠেলে দিচ্ছে কিশোরদের :সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার শুধু মানসিক
স্বাস্থ্য নয়, অপরাধের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে কিশোরদের। র্যাবের তথ্যানুযায়ী,
গত ছয় বছরে দেশে মোট ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা
হয়েছে।
এর মধ্যে একটি
বিশাল অংশ ধরা পড়েছে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত অভিযানে।
গ্রেফতার হওয়া এসব কিশোরের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা
ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে
নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত।
যখন
পড়তে বসি, মোবাইল ছাড়া থাকতে পারি না : করোনা ভাইরাস মহামারির পর অনলাইন
শিক্ষার প্রসার ঘটলেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ হারানোর প্রবণতা বেড়েছে
ভয়াবহভাবে। এখন ক্লাসে শিক্ষক পাঠদান করলেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ
মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। বরং তারা বেশি সময় ব্যয় করছে সোশ্যাল মিডিয়া
কিংবা বিনোদনজগতে। রবিউল ইসলাম নামক এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থী বলেন, ক্লাসে মন বসে না। মোবাইল হাতে নিলেই সোশ্যাল মিডিয়া
টানতে থাকে। তখন ভিডিও দেখি বা বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট করি। নারায়ণগঞ্জের
অষ্টম শ্রেণির রাইসা বিনতে মুক্ত বলেন, আমি যখন পড়তে বসি, মোবাইল ছাড়া
থাকতে পারি না। অনলাইনে ক্লাস হলে ক্যামেরা বন্ধ করে ফেসবুক চালাই।







































