
সাআদ মাহমুদ। হালুয়াঘাট উপজেলা প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ভবন সংস্কারের জন্য ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে মোট ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও অর্থবছর শেষ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোতে দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজের প্রমাণ মেলেনি। এ অবস্থায় বরাদ্দের অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন ছাড়াই বিল প্রক্রিয়াকরণ করা হয়েছে। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, সরকারি অনুমোদন নিয়ে অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল ও পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় ধারা, ধুরাইল, কৈচাপুর, গাজিরভিটা, স্বদেশী ও জুগলী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সংস্কারের জন্য প্রতিটি ইউনিয়নের অনুকূলে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী অর্থবছরের মধ্যেই সংস্কারকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে যা মিলেছে
রোববার (২ আগস্ট) ধারা, ধুরাইল, কৈচাপুর ও গাজিরভিটা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও দৃশ্যমান সংস্কারকাজের কোনো চিহ্ন নেই।
ধারা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তরা খসে পড়েছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। শৌচাগারগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী এবং পানির লাইনও অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
ধারা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “ভবনটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। শুনেছি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষ হলেও কোনো কাজ হয়নি।”
ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “সংস্কারের জন্য বরাদ্দের কথা শুনেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কাজ শুরু হয়নি। ভবনটির বিভিন্ন অংশে সংস্কার প্রয়োজন।”
ধুরাইল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল হাসেম বলেন, “কোনো সংস্কারকাজ হতে দেখিনি। অভিযোগের সত্যতা থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
কৈচাপুর ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব সহকারী শফিকুর রহমান এবং গাজিরভিটা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুব্রত দেবনাথ জানান, গত অর্থবছরে তাদের ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, স্বদেশী ও জুগলী ইউনিয়ন পরিষদেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।
অভিযোগের বিষয়ে ইউএনওর ব্যাখ্যা
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, গত ৩০ মে ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন সংস্কারের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যায়। বর্ষাকালে ভবনে রং করলে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সংস্কারকাজ শুরু করা হয়নি।
তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে বরাদ্দের অর্থ পে-অর্ডারের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। ছয়টি প্রকল্পের জন্য ঠিকাদারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে এটিই প্রথম অভিযোগ নয়
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদের বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে ১ শতাংশ তহবিলের অর্থ বণ্টনে ২৫ শতাংশ কমিশন (ঘুষ) নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগটি বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তাকে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় বদলি করা হয়।
তবে সে সময় ইউএনও ফয়সাল আহমেদ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বদলিকে তিনি প্রশাসনের নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
এদিকে হালুয়াঘাটে ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সংস্কার বরাদ্দ নিয়ে ওঠা বর্তমান অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।



























