
মো. মুরাদ মৃধা রাণীনগর সরকার কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করলেও নওগাঁর রানীনগরে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, ডিলারের দোকানে সার থাকলেও নির্ধারিত দামে তা মিলছে না। বস্তাপ্রতি ৩৫০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এতে চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।কৃষকদের অভিযোগ, সার উত্তোলন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত যথাযথ নজরদারি না থাকায় একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানো হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করা হলেও কার্যকরভাবে তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান ও জরিমানা করা হলেও অভিযানের পরদিনই আবার আগের দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতি আমন মৌসুমে রানীনগরে ১৯ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জমি প্রস্তুত ও ধানের চারা রোপণের শুরুতেই সারের বাড়তি দাম কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উৎপাদন খরচ বাড়লে অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে চাষাবাদ কমিয়ে দিতে পারেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।রানীনগর উপজেলায় বিসিআইসির ১১ জন এবং বিএডিসির ১৯ জন সার ডিলার রয়েছেন। চলতি আগস্ট মাসে বিএডিসির মাধ্যমে প্রায় ৬০০ মেট্রিক টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিসিআইসির ডিলাররাও বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছেন। ফলে সরকারি হিসাবে সারের পর্যাপ্ত মজুত ও বরাদ্দ থাকার পরও কেন কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।গত বুধবার উপজেলার আবাদপুকুর বাজারের অভিযানের পরও কমছে না সারের বাড়তি দামমুন্না ট্রেডার্স থেকে সার কেনা এক কৃষক বলেন, 'তিনি পাঁচ বস্তা সার কিনেছেন। দোকান থেকে ৫ হাজার ৭৫০ টাকার মেমো দেওয়া হলেও তার কাছ থেকে ৬ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।' অভিযান হওয়ার পরও বেশি দাম নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপি ১ হাজার ৬৮০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ঝুরা পটাশ ১ হাজার ১২০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা কিনলে দাম আরও বেশি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি দামের সঙ্গে বাজারদরের এই ব্যবধান কৃষকদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।খানপুকুর বাজারের মেসার্স সোনার বাংলা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সবুজ হোসেন বলেন, 'চায়না ডিএপি ১ হাজার ৪৪০, দেশি ডিএপি ১ হাজার ৩৮০, পটাশ ১ হাজার ১৩০ এবং ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৩৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।' তিউনেশিয়ার টিএসপি ১ হাজার ৯০০ এবং মরক্কোর টিএসপি ১ হাজার ৭২০ টাকায় কিনতে হয় বলেও জানান তিনি। তিনি নিজেকে সাব-ডিলার দাবি করে বলেন, 'কীটনাশক বিক্রির পাশাপাশি কৃষকদের চাহিদার কারণে সার রাখতে হয়। এতে তেমন লাভহয় না।'আবাদপুকুর বগারবাড়ি এলাকার এক সাব-ডিলার জানান, আবাদপুকুর থেকে সার আনার সময় প্রতি বস্তায় প্রায় ২০ টাকা গাড়ি ভাড়া পড়ে। ১০ টাকা লাভে সার বিক্রি করেন তিনি। অনেকসময় কেনা দামেই সার বিক্রি করতে হয় বলেও দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে রানীনগরের ফটিক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শহিদুল ইসলাম ফটিক বলেন, 'উপজেলায় সারের সংকট নেই। তবে বাইরে থেকে সার কেনার কারণে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।' তিনি ডিএপি ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানান।রানীনগর উপজেলা বিএডিসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম বলেন, 'সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির সুযোগ নেই।' তিনি সব ডিলারকে সরকারি মূল্যে সার বিক্রির নির্দেশ দিয়েছেন।' কোনো ডিলার বেশি দামে বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও জানান তিনি।রানীনগর উপজেলা বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি আব্দুস ছাত্তার শাহ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা জাহিদ কামাল বলেন, 'উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে একাধিক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।'নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, 'রানীনগরে পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ রয়েছে। সারের কোনো সংকট নেই।' কৃষকদের বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারের কাছ থেকে মেমো নিয়ে সার কেনার পরামর্শ দেন তিনি। কোনো ডিলার বেশি দাম নিলে কৃষকদের কৃষি বিভাগে অভিযোগ করার আহ্বান জানান। সরকারি নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০, ডিএপি ১ হাজার ৫০ এবং এমওপি ১ হাজার টাকা। কৃষকদের দাবি, শুধু অভিযান বা জরিমানা নয়, নিয়মিত বাজার তদারকি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হলে সরকারি ভর্তুকির সুফল সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছাবে।





























