
দত্তর
ইকরাম আকাশ
বেরঙের এক কাফেলা যেন মৃত ছাল জড়িয়ে শীর্ণকায় এক এলাকা। এলাকায় বেশ হয়েছে মাতব্বরি কোণঠাসায় জীর্ণশীর্ণ জনগণ। শুধুমাত্র ভীতি, কুসংস্কার ও আর্থিক দৈন্য পুরো এলাকা জুড়ে রাজত্ব বিজন নামের দুষ্ট লোকের, যার আবার রয়েছে পঁচিশ-ত্রিশ জনের বাহিনী। তাঁদের দিয়েই সম্পূর্ণ এলাকায় বিজনের রাজত্ব।
হঠাৎ একদিন বিজনের রোগ হয়। কিন্তু কি রোগ জানে না? তাছাড়া অত্র এলাকায় কোনো ডাক্তার নেই। ডাক্তার দেখাতে হলে যেতে হবে সদর হাসপাতাল তবে সেখানেও যাতায়াতের অসুবিধা! "বিজন বলে উঠে
- নিমতলায় যেহেতু ডাক্তার নেই, আমিও অসুস্থ সেবা পাচ্ছি না সুমিতের কাছে গিয়ে একটা ডাক্তার নিয়ে আয়"। কতদিন এখানে অসুখ-বিসুখে মরে যাবো বল?
বিজনের কাছের লোক রাজন।
-সে বলে " ভাই সুমিত ডাক্তারের কাছে গেলে সে কি ডাক্তার দিবে কিংবা কাউকে পাঠাবে? সে হয়তো তোয়াক্কা করবে না আমরাই একটা ডাক্তার নিয়ে আসি কি বলেন আপনি " ?
বিজন চক্ষু বড় করে বলে
-হতচ্ছাড়া তোর জানাশোনা ডাক্তার থাকতে আমাকে কষ্ট করতে হচ্ছে কেন? দ্রুত নিয়ে আয় "। তাছাড়া "ঐ ডাক্তারকে আমার কব্জা করা জায়গায় বসিয়ে অন্যান্যদের চিকিৎসা করাবো। ঐ ডাক্তারের সব খরচ আমার শুধু ইনকাম যা করবে তার দু'আনা নিতে হবে"।
রাজনের দুষ্ট চাহনি ও বাঁকা হাসিতে বোঝা যায় আয়ের উৎসে খানিক অংশ না চাইতে চলে এলো বলে মহাখুশি।
- "রাজন তাঁর ছোট ভাই মোল্লা মিয়াকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে এবং পরিচয় করিয়ে দেয় সে বিশাল বড় মাপের একজন ডাক্তার"। মোল্লা মিয়া ডাক্তার সুমিতের সাথে কিছুদিন ছিল কিন্তু স্বভাব ভালো নয় তাই তাড়িয়ে দেয়। সেজন্যই রাজন সুমিত ডাক্তারকে দেখতে পারে না"।
মোল্লা মিয়া জানে -
"বিজন বড়ই দুষ্ট লোক তবে তার কারসাজি যাতে ধরা না যায়, সে বিষয়ে রাজনের সাথে পরামর্শ করে নেয়"। হাতুড়ে ডাক্তারি করে মোল্লা মিয়া বিজনকে সুস্থ করে ফেলে।
বিজন মহাখুশি হয়ে রাজনকে বলে,
-মোল্লা ডাক্তার জাদুকরী ডাক্তার , তাঁর যেন কিছুতেই নারাজি হয়। তাঁকে ধরে রাখা লাগবে এতে আমার টাকার স্রোত কমবে না।
রাজনের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি বলে দেয় তার উদ্দেশ্য সফল। পরদিন রাজন এলাকায় মাইকিং করে বলে বেড়ায়
-" বিজন ভাই এলাকার চিকিৎসা সুবিধায় কম টাকায় চিকিৎসা করাতে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এনেছেন। আপনারা জানেন তিনি বেশ কিছুদিন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন সদর হাসপাতালের ডাক্তাররা ভালো চিকিৎসা দিতে পারেনি। বরং তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। এসময় মোল্লা ডাক্তার ফেরেশতা হয়ে এসে বিনে পয়সায় বিজন ভাইকে সুস্থ করে তুলেন "।
-সবার ভালোর উদ্দেশ্যে মোল্লা ডাক্তারকে বুঝিয়ে "বিজন ভাই নিমতলাবাসীর জন্য এখানেই উনাকে রোগী দেখার জন্য নিজের জায়গায় ঘর তুলে দাবাইখানা তৈরি করে দিয়েছে"। সবাই কম পয়সায় মোল্লা ডাক্তারকে দেখিয়ে অল্প সময়ে সুস্থতা অর্জন করতে পারবেন এবং সদর হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
চুপিসারে রাজনের ফন্দি সফল হওয়াতে ছোট ভাই মোল্লা ডাক্তারের সাথে সন্ধি করে,
-দেখ মোল্লা সব ভিত্তি ঠিক করে তোর অবস্থান এনে দিয়েছি। বিজনকে ভুলেও দু'আনা দিবি না। রোগী বিশ-পঁচিশের হলে বলবি দশজন।
মোল্লার অট্টহাসি ও বিচ্ছিরি বাহানায় বলে উঠে
- " ভাই আমি অতোটা কাঁচা নই,সুমিত ডাক্তার শিক্ষিত হয়ে যেখানে ফেল হয়েছে। সেখানে এসব বিজন আবার কে? দু'ভাই মিলে শুধু রোগী দেখবো আর টাকা গুণবো!
বিজনের দাবাইখানায় বেশ রোগীর আনাগোনা, চাইলেও কেউ সদর হাসপাতালে যেতে পারে না। যে রোগই হোক না কেন মোল্লা ডাক্তার সর্বেসর্বা! বিজনের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় কেউ দু'কথা বলার সাহস পায় না। এদিকে ভুল চিকিৎসায় বেশ কিছু রোগীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। এতে মোল্লা ডাক্তারের ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁর চাই টাকা সেজন্য একই ধরণের ঔষধ দিয়ে সকল রোগের চিকিৎসা দেয়। যা রোগীদের অজান্তেই তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতিসাধন করছে।
বিজনেরও তাতে কী আসে যায়? দাবাইখানা থেকে পর্যাপ্ত আয় হচ্ছে। যার জন্য সে মোল্লাডাক্তারের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে জানে না মোল্লা ডাক্তার ও রাজনের কারসাজিতে সে নিজেও বিশাল বিপদে পড়তে যাচ্ছে।
কাজের বদৌলতে নিমতলায় আসেন শিপন। ডাক্তার সুমিতের পরিচিত শিপন দেখেন এলাকায় দাবাইখানায় ভুল চিকিৎসায় বহু রোগী দিনদিন আরও বেশি রোগাক্রান্ত হচ্ছে। হয়তো মারাও যেতে পারে তবে বিজনও তার দলবলের জন্য কেউ হয়তো কিছু বলতে পারে না। শিপন দেখে মোল্লা মিয়া চিকিৎসা দিচ্ছে কিন্তু সে তো চিকিৎসক নয়। তাছাড়া ডাক্তার সুমিতের নাম ব্যবহার করে ভুলভাল চিকিৎসা দেওয়ায় তাকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় এর প্রতিরোধ দরকার।
অতঃপর শিপন ডাক্তার সুমিতের কাছে গিয়ে জানায়
- মোল্লা ডাক্তার আপনার নাম ব্যবহার করে নিমতলায় রোগী দেখছে এবং ভুল চিকিৎসার জন্য বহু রোগী মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। আপনি কিছু করুন নাহলে অসহায় রোগীদের সর্বস্ব শেষ হয়ে যাবে।
ডাক্তার সুমিত এসব শুনে প্রচন্ড রেগে যান এবং দ্রুত মোল্লা মিয়ার সাজার ব্যবস্থা করতে চায়। কারণ পূর্বেও ডাক্তার সুমিতের অনুপস্থিতিতে মোল্লা মিয়ার ভুল চিকিৎসাতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পূর্বে মোল্লা মিয়া সাজা থেকে বাঁচতে পালাতে সক্ষম হয়। কিন্তু এবার সুমিত এসব হতে দিবে না। সমস্ত তথ্য নিয়ে জানতে পারে,বিজন-রাজনের ছত্রছায়ায় মোল্লা মিয়া চিকিৎসার অপব্যবহার করছে। বিজন-রাজনের সম্পর্কেও তো সুমিত অবগত। তাদের ভীত নাড়াতে এবং নিমতলাবাসীকে উদ্ধার করতে জেলা সিভিল সার্জন বরাবর অভিযোগ করেন।
অবৈধ দাবাইখানা পরিচালনা, ভুল চিকিৎসা ও রোগীর স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা এবং সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধা প্রদান উদ্ধৃত করেন। সিভিল সার্জন অফিস হতে থানায় জিডি করে অভিযান চালানো হলে দেখা যায় সম্পূর্ণ অব্যবস্থাপনায় জোরপূর্বক চিকিৎসা প্রদান ও টাকা হাতিয়ে নিয়ে নিজেদের পকেট ভর্তিতে ব্যতিব্যস্ত বিজন-রাজন-মোল্লা মিয়া। রোগীদের ভাষ্যমতে বিজন-রাজনের আধিপত্যে তাঁরা সবাই অসহায়। কারোরই কিছুই করার নেই এখানে। অন্যায়ের রাজত্বে ন্যায়ের আওয়াজ তুলে ধ্বংস হতে কে চায়? অবশেষ শিপন ও ডাক্তার সুমিত বাদী হয়ে নিমতলার সুশৃঙ্খলা ফেরাতে বিজন-রাজন-মোল্লা মিয়া সহ পুরো দলের সদস্যদের আইনের আওতায় নিয়ে আসে। এতে ভুল চিকিৎসা প্রদান,রোগীর মৃত্যুর কারণ, অন্যের নামের ব্যবহার করায় মোল্লা মিয়াকে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং বিজন-রাজনের পূর্ণ দলকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য ২০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং প্রত্যেককে ৩ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। ডাক্তার সুমিতের হাত ধরে নিমতলাবাসী খুশী হয়, যেন নতুন ভোরের কিরণ এসেছে।







































