
সাআদ মাহমুদ, হালুয়াঘাট প্রতিনিধি:২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়া জাতীয় দৈনিক মানবকণ্ঠ-এর হালুয়াঘাট প্রতিনিধি ও হালুয়াঘাট প্রেসক্লাবের কার্যকরী সদস্য সাংবাদিক মো. শফিকুল ইসলাম (দুখু) দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। উন্নত চিকিৎসা, হামলার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং পুনর্বাসনের দাবিতে তার পরিবার, সহকর্মী সাংবাদিক ও সচেতন মহল সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহকালে সে সময়ের দৈনিক গণজাগরণ পত্রিকার প্রতিনিধি শফিকুল ইসলামের ওপর ২০ থেকে ৩০ জন দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা চালায়। লাঠি, রড ও হকিস্টিক দিয়ে মারধরের পাশাপাশি তার ব্যবহৃত ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। হামলায় তিনি মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আহত হন।স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তার মাথায় সাতটি সেলাই দেন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, উত্তরা কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইএনএস) এবং ময়মনসিংহ ও ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ চিকিৎসা গ্রহণ করেন।ভুক্তভোগী সাংবাদিক জানান, ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ তার নাক ও মুখ দিয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর থেকে তিনি নাক ও ন্যাসোফ্যারিংসজনিত জটিল সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আঘাতজনিত কারণে তার ইনফিরিয়র টারবিনেট ও বাম ন্যাসোফ্যারিংসে অস্বাভাবিকতা এবং স্কার টিস্যু অ্যাডহেশন তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্ট, রক্তক্ষরণ ও অন্যান্য জটিলতার কারণ হতে পারে। দ্রুত উন্নত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন রয়েছে বলে চিকিৎসকরা মত দিয়েছেন।এদিকে হামলার ঘটনায় অভিযোগ দায়ের ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান বিচারিক অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শফিকুল ইসলাম। তার অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি।সাত সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি শফিকুল ইসলাম বর্তমানে কর্মক্ষমতা হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটির সঞ্চয় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তার বৃদ্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তানরা প্রতিনিয়ত তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন।শুধু চিকিৎসাই নয়, পুনর্বাসন নিয়েও ভোগান্তিতে রয়েছেন এই সাংবাদিক। সরকারের পক্ষ থেকে বন্দোবস্তের জন্য বরাদ্দ দেওয়া জমি সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, সেটি প্রায় পাঁচ ফুট গভীর গর্তাকৃতির এবং বর্ষাকালে পানিতে তলিয়ে যায়। সেখানে যাতায়াতের কোনো উপযুক্ত রাস্তা না থাকায় বসতবাড়ি নির্মাণ তো দূরের কথা, স্বাভাবিক ব্যবহারও সম্ভব নয়। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাহসিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটে শফিকুল ইসলাম (দুখু)-কে ময়মনসিংহ বিভাগের (গ) ক্যাটাগরিতে ৩৭৬ নম্বর গেজেটভুক্ত "জুলাই যোদ্ধা" হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে তাকে আহত ও সাহসী সাংবাদিক হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর আইডিইবি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি "জুলাই বার্তাবীর" সম্মাননায়ও ভূষিত হন।ভুক্তভোগী সাংবাদিকের পরিবার, স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা তার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং বন্দোবস্তের জমিকে দ্রুত বসবাসযোগ্য করে পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, আন্দোলনের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত একজন স্বীকৃত জুলাই যোদ্ধা সাংবাদিকের চিকিৎসা, ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।





























