
নুরুল কাদের , আলীকদম, বান্দরবান। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পর শুক্রবার সকাল থেকে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও কাটেনি বন্যা পরিস্থিতির দুর্ভোগ। নদীর পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ কমেছে। ফলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল, নদীতীরবর্তী বসতি ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। শতাধিক পরিবার এখনো পানিবন্দি কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। অন্যদিকে কৃষকের চোখে-মুখে হতাশা। পানির নিচে তলিয়ে থাকা ফসল এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ১ নং আলীকদম সদর ইউনিয়ন ও ২ নং চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চল। পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় শতাধিক পরিবারের বসতঘর প্লাবিত হয়েছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও অধিকাংশ নিচু এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে। অনেক বসতভিটার আঙিনা, রান্নাঘর ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এখনো পানির মধ্যে পড়ে রয়েছে।বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন। আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম শুক্রবার উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন এবং তাদের মধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসহায় মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মোট ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে একসঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ১৩০ জন মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। পাশাপাশি শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে এসব সহায়তা বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।এদিকে আলীকদম সেনা জোনের সদস্যদেরও দুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আলীকদম যুব ইউনিট, বিভিন্ন সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক সংগঠন নিজ উদ্যোগে দুর্গত মানুষের বাড়ি ও আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কার্যক্রম দুর্গত মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।আলীকদম-লামা সড়কের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন অংশে পুরু কাদার স্তর জমে রয়েছে। পানি কিছুটা নেমে গেলেও কাদা জমে থাকায় যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ও বাস সহ অন্যান্য হালকা যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক স্থানে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও কাদায় আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সড়ক পরিষ্কার ও যান চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা না নিলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে।তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন নদীতীরবর্তী কৃষকরা। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে শত শত একর কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। আমন ধানের চারা, বিভিন্ন মৌসুমি সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য এখনো পানির নিচে থাকায় সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অনেক কৃষক জানান, কয়েক মাসের শ্রম ও বিনিয়োগ মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে। পানি দ্রুত নেমে না গেলে অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে যাবে এবং চলতি মৌসুমে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।যদিও শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবে থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। নদীর পানি ধীরে ধীরে কমলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। নিম্নাঞ্চলের অনেক সড়ক কাদা ও পানিতে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে রয়েছে। অনেক এলাকায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়নি।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও সহায়তা প্রদান করা হবে।স্থানীয়দের আশঙ্কা, আবারও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তাই তারা দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং বন্যাদুর্গত পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।





























