
গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে চোরাচালান সিন্ডিকেট। প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মধ্যেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা ইছামতি নদী ও স্থলপথ ব্যবহার করে প্রতিরাতে দেশে ঢুকছে ভাইরাসযুক্ত নিন্মমানের গলদা চিংড়ির রেনু (পোস্ট লার্ভা বা পিএল), আইস, ফেনসিডিল, এলএসডি, কোরেক্স, ফিনাডেলফিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। স্থানীয়দের ভাষায়, দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সাতক্ষীরার পুরনো ‘গডফাদার’ চক্র নতুন করে সীমান্তজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক সচল করছে। সীমান্ত নদী ইছামতি যেন নিরাপদ রুট। ইছামতি পাড়ে রাত নামলেই ‘বর্ডারলেস’ বাংলাদেশ!অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার দেবহাটা, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলার একাধিক সীমান্ত পয়েন্ট এখন ছোট ছোট ‘চোরাঘাটে’ পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামলেই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের ভাড়াটে ‘রাখাল’ বা ‘মুটে’ নামে পরিচিত বাহকরা ইছামতি নদী সাঁতরে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থলপথে ভারত থেকে ভাইরাসযুক্ত নিন্মমানের গলদার রেনু, মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য অবৈধ মালামাল দেদারছে নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত থেকে চোরাচালানী পণ্য বাংলাদেশে নেওয়ার বিনিময়ে তারা পেয়ে থাকে মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক।সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র হাসাখালি-কালুতলা ক্যাম্পের সদস্যরা পৃথক অভিযানে আব্দুর রহিম, হাবিবুল্লাহ সরদার ও মিলন হোসেন নামের তিন বাংলাদেশিকে আটক করেছে। আটককৃত আব্দুর রহিম দেবহাটা উপজেলার নাংলা ঘোনাপাড়া গ্রামের আব্দুল গফফারের ছেলে, হাবিবল্লাহ চরশ্রীপুর গ্রামের আজিবর সরদারের ছেলে এবং মিলন হোসেন পার্শ্ববর্তী টাউনশ্রীপুরের ইমান আলীর ছেলে। ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং গলদা চিংড়ির রেনু ও ফেনসিডিল পাচারের সময় তাদেরকে আটক করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ভারতের হাসনাবাদ থানার ওসি সঞ্জয় কুমার রায়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা ভারতেই কারাভোগ করছেন।এদিকে, যৌথ অভিযানে সাতক্ষীরার হাড়দ্দাহ সীমান্ত থেকে বিপুল পরিমান আইস ও হাজার বোতল ফেনসিডিল এবং কালিগঞ্জের খানজিয়া সীমান্ত থেকে কয়েক হাজার বোতল ফেনসিডিলসহ কয়েকজন মাদক কারবারিকে আটক করেছে র্যাব ও বিজিবি। তাছাড়া প্রতি রাতে দেবহাটা সীমান্ত থেকে ভারতীয় নিন্মমানের ভাইরাসযুক্ত গলদা রেনুর চালান আটক করছে দেবহাটা থানা পুলিশ। যদিও সে অভিযান নিয়ে নাটকীয় নানা তথ্যও আসছে সামনে। চোরাকারবারিদের একটি গ্রুপ বলছে, ফটোসেশনে দেবহাটা থানা পুলিশের দেখানো পলিব্যাগে কোনো গলদার রেনুই ছিল না। প্রতিরাতে মোটা অংকের টাকা চাঁদা আদায়কে আড়াল করতেই পানিভর্তি পলিব্যাগ উদ্ধার ছিল স্থানীয় বিএনপি নেতা ও চোরাকারবারিদের স্ক্রিপ্টেড নাটক। একইদিনে আলীপুর থেকে প্রায় ৬৩ লাখ টাকার স্বর্ণসহ এক নারীকেও আটক করে বিজিবি। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হলেও সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান যেন কোনোভাবে থামছেই না।সপ্তাহব্যাপী চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য দেবহাটা সীমান্তে চালানো অনুসন্ধানে একাধিক সূত্র বলছে, সীমান্তের ওপারে ভারতীয় চোরাকারবারি চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সাতক্ষীরার শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেটের গডফাদাররা পুরো চোরাচালান নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে স্থল ও জল সীমান্ত লাগোয়া ৫ উপজেলাকেই চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে গডফাদাররা। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি চোরাচালান সংঘটিত হয় দেবহাটার বিস্তৃর্ণ সীমান্ত দিয়ে। তারপরই কালিগঞ্জ সীমান্ত এবং শ্যামনগরের সুন্দরবনাঞ্চল। বাকিটা সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়ার সীমান্ত দিয়ে। দেবহাটার ভাঁতশালা, কোমরপুর নিমতলা, শিবনগর রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রের বনাঞ্চল, টাউনশ্রীপুর, চরশ্রীপুর, বসন্তপুর, খানজিয়া, নাংলা-নওয়াপাড়া, কালীগঞ্জের সুইলপুর ও তার আশপাশের এলাকা, শ্যামনগরের কৈখালিসহ সুন্দরবনের কোলঘাঁষা কিছু এলাকা, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাড়দ্দাহ, শাঁখরা, ভোমরা ও তার আশপাশের এলাকা এবং কলারোয়া উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ও কাঁকডাঙাসহ আশপাশের সীমান্ত এলাকা গুলোকেই ছোট ছোট ‘চোরাঘাট’ হিসেবে চোরাচালানের নিরাপদ রুট বানিয়ে ফেলেছেন গডফাদাররা।রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক অবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে কন্ট্রোলের ক্ষমতার ওপর ভর করে একেক সিন্ডিকেট, এমনকি বর্ডার থেকে শুরু করে প্রশাসন ম্যানেজ- প্রতিটি সেকশন নিয়ন্ত্রণ করেন একেক গডফাদার। এসব সিন্ডিকেটগুলোর নেতৃত্বে থাকা শীর্ষ চোরাকারবারিদের মধ্যে রয়েছেন, সাতক্ষীরার জাহাঙ্গীর, মতিনুর, ঝিকরগাছার বাবলা, কালিগঞ্জের কিবরিয়া, পারুলিয়ার রবিউল ইসলাম রবি, আদর, মালেক, আজগার, মধু, মান্নান, শফিকুল হাজি, সাঈদ, মোসলেম, শরিফুল ইসলাম, হোসেন ও সালাম, উপজেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি আব্দুল আলিম, আব্দুল্লাহ, আহসান, সাগর, কবির মেম্বার ও আনারুলসহ আরও কয়েকজন চোরাকারবারি।
সীমান্ত টপকে বাংলাদেশে ঢোকার পর ভাইরাসযুক্ত গলদা রেনু’র চালান প্রাইভেটকারে করে দ্রুত নেওয়া হয় দেবহাটার কুলিয়া ব্রীজের নিচে কথিত রেনু বাজারে। সেখান থেকে তা সাতক্ষীরার প্রায় প্রত্যেকটি মাছের ঘেরসহ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়, যা চাষ করে প্রতিবছর সর্বস্ব খুঁইয়ে পথে বসছেন হাজারো মৎস্য চাষি ও খামারীর পরিবার। অন্যদিকে মাদকের চালান বর্ডার থেকেই চলে যায় চোরাকারবারিদের গোপন ডেরায়, পরে হাতবদল হয়ে পৌঁছায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে।যদিও সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল সাতক্ষীরার দু’টি বিজিবি ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক, এমনকি খোদ পুলিশ সুপারও। ফলে সীমান্তের বিজিবি ক্যাম্প গুলোর কমান্ডার ও কিছু অসাধু সদস্য, সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশের কিছু অসৎ অফিসার এবং স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ম্যানেজ করেই চলছে এই রমরমা চোরাচালান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের কয়েকজন জানিয়েছেন, প্রতিটি চালানের বিপরীতে গলদা রেনু ও মাদকের বস্তা গুনে বিজিবি’র নামে বলপ্রতি ২ হাজার টাকা পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পের কমান্ডারদের হাতে। আর দেবহাটার রেনু’ বাজারে বসেই থানা, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এমনকি পুলিশ সুপারের নামে বলপ্রতি ১৮শ’ টাকা হারে আদায় করেন হামিদুল হক শামীমের নেতৃত্বাধীন উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রিত একটি চক্র। যা রীতিমতো ওপেন-সিক্রেট। তাদের দাবি, চোরাকারবারিদের থেকে আদায়কৃত সেই অবৈধ অর্থ পরে প্রশাসন ও বিএনপির বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায় এবং গলদা রেনু’র বস্তা গুনে টাকার হিসাব রাখতে বর্ডার থেকে শুরু করে কুলিয়ার ওই রেনু’র বাজারে সার্বক্ষণিক অঘোষিত মোতায়েন থাকেন। দেবহাটা থানার কথিত সোর্স হবিবর রহমান ওরফে হবি। চালান বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর ভারতীয় চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের পাওনা মেটানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। কুলিয়ার হুন্ডি মামুন এবং সখিপুর রেজিষ্ট্রি অফিস মোড়ের স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি ব্যবসায়ী রুহুল আমিনসহ কয়েকজনের মাধ্যমে প্রতিরাতে চোরাচালানের প্রায় কোটি টাকা অবৈধভাবে পাচার হয় ভারতে।সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিসার জি.এম সেলিম বলেন, ‘ভারত থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই চোরাই পথে গলদা চিংড়ির রেনু উদ্বেগজনক হারে বাংলাদেশে ঢুকছে। এসব রেনু বিভিন্ন ভাইরাস ও রোগ জীবানুতে আক্রান্ত থাকে। ফলে জেলার অধিকাংশ মৎস্য ঘেরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিবছর ব্যপক হারে রপ্তানীযোগ্য চিংড়ি মারা গিয়ে চাষিরা সর্বস্বান্ত হন। তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরায় বর্তমানে যে পরিমান গলদার রেনু উৎপাদিত হচ্ছে তাতে সহজেই চাহিদা পূরণ সম্ভব। কুলিয়া রেনু’র বাজারে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় দেবহাটা উপজেলা প্রশাসনকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’সীমান্তে চোরাচালানের বিষয়ে জানতে চাইলে নীলডুমুর ১৭ বিজিবি ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. শাহরিয়ার রাজীব বলেন, ‘সীমান্তে চোরাচালান ঠেকাতে এরইমধ্যে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত ল্যান্ড টহলের পাশাপাশি স্পিডবোটে ইছামতির জলসীমাতেও টহল জোরদার, র্যাব-পুলিশের সাথে যৌথ অভিযান, মহাসড়কে ব্যারিকেড বসিয়ে ব্লক রেইড করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে সীমান্তে ভারতীয় অবৈধ গলদা রেনু ও মাদকের বড় বড় চালান আটক হয়েছে। মাঝে মাঝে চোরাকারবারিরা মুঠোফোনে ভুল তথ্য দিয়েও বিজিবিকে মিসগাইড করে। সড়ক থেকে নদী- সবখানেই বিজিবি’র ওপর নজর রাখতে চোরাকারবারিরা গুপ্তচর নিয়োগ করে। কেউ চা দোকানি, কেউ পথচারি আবার কেউ ডিঙ্গি নৌকায় জেলের ছদ্মবেশে নজর রাখে। চোরাচালানের নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ডদের ধরতে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।তবে এ বিষয়ে সাতক্ষীরা ব্যাটেলিয়ান (৩৩ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী আশিকুর রহমানের মোবাইলে একাধিক বার কল দেওয়া হলে তিনি তা রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান স্বত্ত্বেও কীভাবে রাতের পর রাত ধরে চোরাচালান চলছে, আর কিভাবে এই অদৃশ্য সম্রাজ্যের নেপথ্যের গডফাদারদের শেল্টার দিয়ে খোদ প্রশাসনের নামে প্রকাশ্যে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন বিতর্কিত নেতারা? সাতক্ষীরার সীমান্তজুড়ে এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত।জেলার কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, বিজিবি চোরাচালানের পন্য আটক করছে, মাদক জব্দ করছে, কিন্তু মাদকের ছড়াছড়ি সবখানে। ভারতীয় মালামাল তো আসছেই। তবে বিজিবি না চাইলে একটা পিঁপড়াও ইছামতি পার হয়ে এপারে আসবে না।



























