শিরোনাম
গাজীপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু নিউইয়র্কে নোয়াখালী সোনাইমুড়ীর যুবককে গুলি করে হত্যা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিলেন নওগাঁ ম্যাটসের শিক্ষার্থীরা চন্দনাইশে পুকুরের পানিতে ডুবে মামাতো-ফুফাতো ২ ভাইয়ের মৃত্যু আল মোস্তফা সুন্নিয়া মডেল মাদ্রাসায় সবক প্রদান ও জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ:) অনুষ্ঠিত মাম্যাচিংকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করায় বান্দরবানে বি এন পির আনন্দ মিছিল কালীগঞ্জে চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলার অভিযোগ,আহত ৫ মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় ছাত্রদল নেতার ওপর হামলার অভিযোগ জমি বিরোধে নারীকে মারধরের অভিযোগ, রায়পুর থানায় এজাহার ৪৮ গ্রাহকের সোয়া কোটি টাকা আত্মসাতের রহস্য উদ্ঘাটন
সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬
সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬

তিনি নেই, কিন্তু প্রশ্নটি রয়ে গেছে: খালেদা জিয়া আমাদের কী দিয়ে গেলেন?

প্রকাশিত:শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬ | হালনাগাদ:শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২৬ | অনলাইন সংস্করণ

Image


ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি:

১৫ আগস্ট ২০২৬। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম জন্মদিন। কিছু জন্মদিন আনন্দের হয়, কিছু জন্মদিন স্মৃতির। আবার কিছু জন্মদিন এমনও আসে, যখন জন্মদিনের মানুষটি আর আমাদের মাঝে থাকেন না কিন্তু তাঁর জীবন, তাঁর সংগ্রাম, তাঁর উচ্চারণ এবং তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আরও তীব্রভাবে ফিরে আসে মানুষের কাছে। আজ বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন তেমনই এক দিন।

১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। অথচ এবার প্রথমবারের মতো এই দিনটি তাঁকে ছাড়া। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হয়েছে। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু আর তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের মৃত্যু এক বিষয় নয়। মানুষ চলে যান, সময় চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে সময়ের ভেতর বেঁচে থাকেন। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই একজন।

তাঁকে কেউ ভালোবাসেন, কেউ সমালোচনা করেন, কেউ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত, কেউ নন। কিন্তু বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লিখতে গেলে তাঁকে বাদ দিয়ে সেই ইতিহাস সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তিনি কেবল একটি দলের চেয়ারপারসন ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র, গণতন্ত্রের আন্দোলনের অন্যতম মুখ এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বদানকারী একজন রাষ্ট্রনায়ক।

তাঁর প্রথম জন্মদিনে তাই প্রশ্নটি শুধু- ‘আমরা তাঁকে কতটা মনে রাখব?’এটা নয়। প্রশ্ন আরও বড়। একজন বেগম খালেদা জিয়া আমাদের কী দিয়ে গেলেন?

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো তিনি প্রচলিত অর্থে রাজনীতির মানুষ হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি।

তিনি ছিলেন একজন সাধারণ নারী, একজন মা, একজন স্ত্রী। তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যে নারী ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন, তাঁর সামনে কোনো সহজ পথ ছিল না। বরং সামনে ছিল শোক, অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং একটি বিশাল সংগঠনের দায়িত্ব।

১৯৮২ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেত্রীতে পরিণত করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন, বিভিন্ন জোট গঠন করেন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে একাধিকবার আটক হন। সেখান থেকেই তৈরি হয় তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আপসহীনতা।

এই আপসহীনতা সবসময় সবাই একইভাবে দেখেননি। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল নীতির প্রশ্নে দৃঢ়তা; সমালোচকদের কাছে কখনো তা ছিল রাজনৈতিক অনমনীয়তা। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দিকে নিরপেক্ষভাবে তাকালে একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই তিনি সহজ পথের রাজনীতি করেননি।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৯০ একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এই আন্দোলনে ছাত্রসমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি ই একমাত্র নেত্রী যিনি স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় মিছিলের নেতৃত্ব দেন। এই জায়গাটিই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কারণ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের নাম নয়। গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনগণের ভোটের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংগঠনের অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ। বেগম জিয়ার  রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ এই অধিকারগুলোর দাবির সঙ্গে যুক্ত।

১৯৯১ সালে তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। একই সময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত কাঠামো থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়। এটি শুধু একজন নারীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তন।

একজন নারী হিসেবে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতির জন্যও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে।

রাজনৈতিক নেতাদের মূল্যায়ন শুধু তাঁদের বক্তৃতা দিয়ে হয় না। তাঁদের শাসনামলে কী পরিবর্তন এসেছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময়ে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি এবং নারীশিক্ষার বিস্তারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট অগ্রাধিকারও দিয়েছিল।

নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তাঁর সময়ের কিছু নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সেই সময়ের অর্থনৈতিক নীতির সম্পর্ক ছিল।

আজকের বাংলাদেশে কর্মজীবী নারী, নারী উদ্যোক্তা এবং নারী শিক্ষার যে বিস্তৃত বাস্তবতা আমরা দেখি, তার পেছনে বহু সরকারের বহু বছরের অবদান রয়েছে। সেই দীর্ঘ যাত্রায় খালেদা জিয়ার সরকারগুলোর নীতিগত ভূমিকার কথাও ইতিহাসে থাকবে।

তাঁর সরকার অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় সম্ভবত ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়গুলো। ২০০৬ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অস্থিরতা তৈরি হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকে। ২০১৮ সালে মিথ্যা দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদণ্ড হয় এবং ২০২০ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কারাগার থেকে তাঁকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়।

একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী যখন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে, রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ তখন তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব অনেকের কাছে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারত। কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তা হয়নি। বরং তিনি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির একটি প্রতীকে পরিণত হন।

তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। তাঁর চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর অসুস্থতা নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে দেশের রাজনীতি বারবার উত্তপ্ত হয়েছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত কিছু মামলায় উচ্চ আদালতের রায়ও আসে।

কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি আর রাজনীতির মাঠে সক্রিয়ভাবে ফিরতে পারেননি। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ তাঁর মৃত্যুর সংবাদ যখন আসে, তখন বাংলাদেশের রাজনীতি হঠাৎ যেন একটি দীর্ঘ পরিচিত কণ্ঠ হারিয়ে ফেলে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নিয়ে হয়তো তার চেয়ে কম আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর জীবনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক বোঝার জন্য এই ব্যক্তিগত অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ।

স্বামীকে হারিয়েছেন রাজনৈতিক সহিংসতায়। দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন সময় পার করেছেন। তারপর নিজেই দেশের রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী নেত্রী হয়েছেন। একজন নারী হিসেবে তাঁর পথটি সহজ ছিল না।

তিনি এমন এক সময়ে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্বে এসেছিলেন, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল পুরুষপ্রধান এবং রাজনৈতিক সংঘাত ছিল তীব্র। তাঁর সামনে ছিল ব্যক্তিগত শোক এবং জাতীয় দায়িত্ব দুটোই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছেন।

আজ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের কাছে তাঁর স্মৃতি হয়তো একজন রাজনৈতিক নেত্রীর চেয়ে অনেক বেশি একজন মা হিসেবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন একটি রাজনৈতিক সময়ের প্রতীক।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়া উচিত গণতন্ত্রকে ঘিরে।

তিনি সাধারণ জনগণের কাছে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। বিএনপিও তাঁকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও বলেছিলেন, তাঁর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জনগণের অধিকার রক্ষার ভূমিকা স্মরণীয় থাকবে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম কেবল একজন নেতার ব্যক্তিগত অর্জন নয়। গণতন্ত্র কখনো একা কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। এর জন্য প্রয়োজন জনগণ, রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত ভূমিকা।

খালেদা জিয়া সেই সম্মিলিত সংগ্রামে ব্যাক্তির চেয়ে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের মনস পটে। তাই তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় শুধু তাঁর ছবি, ব্যানার কিংবা ফুলে শ্রদ্ধা জানানো নয়।

বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে রাখা- বাংলাদেশ কি সত্যিই এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হতে পেরেছে, যেখানে একজন নাগরিক তাঁর মত প্রকাশ করতে পারবেন, ভোট দিতে পারবেন, রাজনৈতিক সংগঠন করতে পারবেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছে নিজের অধিকার দাবি করতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ দীর্ঘ ২০ বছর পর বাংলাদেশ থেকে ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে এবং বাংলাদেশ ফিরে পেয়ছে তার সেই গণতান্ত্রিক অধিকার। যার জন্য বেগম জিয়ার জীবনভর সংগ্রাম করে গেছেন। 

তিনি কি শুধু বিএনপির নেত্রী? না। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন এটি তাঁর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব দলীয় সীমারেখার চেয়েও বড়।

তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। জাতীয় সংসদে একাধিকবার নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ সময় দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির একটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে একমত না হওয়া মানুষও তাঁকে উপেক্ষা করতে পারেননি। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান-পতন গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের ঐক্যর প্রতীক।

এ কারণেই তাঁর মৃত্যু শুধু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি।

তাঁর জন্মদিনে তাঁকে কীভাবে স্মরণ করা উচিত? প্রথম জন্মদিনে হয়তো সবচেয়ে সহজ কাজ হবে তাঁর ছবি দিয়ে পোস্ট করা। কেউ লিখবেন-“আপসহীন নেত্রী”। কেউ লিখবেন-“গণতন্ত্রের মা” কেউ লিখবেন-“নেত্রী, আপনি নেই কিন্তু আমরা আছি।” এসব আবেগ স্বাভাবিক।

কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ককে সত্যিকার অর্থে স্মরণ করতে হলে তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্নের সঙ্গে বর্তমানকে মিলিয়ে দেখতে হয়। খালেদা জিয়ার জন্মদিন তাই শুধু অতীতের স্মৃতিচারণের দিন হতে পারে না। এটি হতে পারে ভবিষ্যতের অঙ্গীকারের দিন।

যদি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল শিক্ষা গণতন্ত্র হয়, তাহলে আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হবে। যদি তাঁর রাজনীতির মূল বক্তব্য জনগণের অধিকার হয়, তাহলে জনগণের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের একটি বড় অংশ হয় রাজনৈতিক স্বাধীনতা, তাহলে ভিন্নমতের মানুষের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সেই জাতীয় স্বার্থকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে হবে।

ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের মূল্যায়ন তাঁদের জীবদ্দশায় শেষ করা যায় না। বেগম জিয়াও তেমন একজন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সাফল্য আছে, ব্যর্থতা আছে। অর্জন আছে, বিতর্ক আছে। প্রশংসা আছে, সমালোচনাও আছে। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন।

তিনি রাজনীতির মাঠে ছিলেন, যখন রাজনীতি ছিল উত্তাল। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, যখন রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি বিরোধী দলে ছিলেন, যখন গণতন্ত্র নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। তিনি কারাগারে ছিলেন, যখন তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি অসুস্থ ছিলেন, তবু তাঁর নাম রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যায়নি। আর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম জন্মদিনেও তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে নন।

এটাই একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাননি; বরং সময় তাঁকে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করেছে।

বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম জন্মদিন তাঁর মৃত্যুর পর। এবার আর তিনি জন্মদিনের শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন না। কেউ তাঁর হাতে ফুল তুলে দিতে পারবে না। কোনো মঞ্চে তাঁর জন্য চেয়ার রাখা হবে না। কোনো সমাবেশে তাঁর কণ্ঠে বক্তব্য শোনা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম থাকবে।

থাকবে একজন নারীর অসাধারণ রাজনৈতিক উত্থানের গল্প। থাকবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ইতিহাস। থাকবে ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ইতিহাস। থাকবে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অধ্যায়। থাকবে শিক্ষা ও সামাজিক নীতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। থাকবে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের স্মৃতি। থাকবে কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বের ইতিহাস। থাকবে অসুস্থ শরীর নিয়েও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন নেত্রীর গল্প।

আর সবচেয়ে বড় কথা, থাকবে একটি প্রশ্ন - একজন খালেদা জিয়া কি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন, নাকি তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক প্রতীক? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।

তবে আজ তাঁর জন্মদিনে একটি বিষয় বলা যায় মানুষের মৃত্যু তাঁর শারীরিক উপস্থিতির অবসান ঘটায়, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শেষ করে দিতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়া নেই। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো এখনো আছে। গণতন্ত্র কতটা নিরাপদ? জনগণের ভোট কতটা স্বাধীন? রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক? রাজনীতি কতটা সহনশীল?ভিন্নমতের মানুষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত? আর বাংলাদেশ তার ভবিষ্যৎ কোন পথে নির্মাণ করবে?

সম্ভবত তাঁর প্রথম মৃত্যুপূর্ব জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে যথার্থ উপায় হলো এই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে আনা। কারণ ইতিহাসের বড় মানুষদের স্মরণ শুধু ফুল দিয়ে হয় না।তাঁদের রেখে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই তাঁদের সবচেয়ে গভীরভাবে স্মরণ করা যায়।

আজ তাঁর জন্মদিন। আজ তিনি নেই। তবুও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায়, অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে এবং একটি দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বয়ানে- বেগম খালেদা জিয়া থাকবেন।শুভ জন্মদিন, দেশনেত্রী।

আপনি নেই- কিন্তু আপনার সময়, আপনার সংগ্রাম এবং আপনার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো এখনো আমাদের সামনে। যে পথে এখন হেটে চলেছেন তার ই পুত্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। যাকে তিনি দেখছেন সেই ওপার থেকে।


লেখক: ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি

চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন

[email protected] 



আরও খবর




গাজীপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু

নিউইয়র্কে নোয়াখালী সোনাইমুড়ীর যুবককে গুলি করে হত্যা

মাম্যাচিংকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করায় বান্দরবানে বি এন পির আনন্দ মিছিল

চিরিরবন্দরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আকস্মিক পরিদর্শনে হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া

স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিলেন নওগাঁ ম্যাটসের শিক্ষার্থীরা

চন্দনাইশে পুকুরের পানিতে ডুবে মামাতো-ফুফাতো ২ ভাইয়ের মৃত্যু

চকরিয়ায় নারী নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী রুনা আক্তার এবং তার কন্যার ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন

কুমিল্লায় গৃহবধূ হত্যাকান্ডের মামলায় শশুর-শাশুড়ি সহ ৩ জনের যাবজ্জীবন

আল মোস্তফা সুন্নিয়া মডেল মাদ্রাসায় সবক প্রদান ও জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ:) অনুষ্ঠিত

মাম্যাচিংকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করায় বান্দরবানে বি এন পির আনন্দ মিছিল

কালীগঞ্জে চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলার অভিযোগ,আহত ৫

মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় ছাত্রদল নেতার ওপর হামলার অভিযোগ

জমি বিরোধে নারীকে মারধরের অভিযোগ, রায়পুর থানায় এজাহার

৪৮ গ্রাহকের সোয়া কোটি টাকা আত্মসাতের রহস্য উদ্ঘাটন

মুরাদনগরে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে বিএনপি নেতা আজিজ মোল্লা

জরুরি ঘোষণায় সাড়া, চলন্ত ট্রেনেই অসুস্থ সাংবাদিককে চিকিৎসা দিয়ে প্রশংসিত ডা. মো. কামরুল ইসলাম

অষ্টগ্রামে পৃথক অভিযানে ৫০ পিস ইয়াবা সহ তিন মাদক কারবারি আটক

নওগাঁ ম্যাটস শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শাটডাউন ও অবস্থান কর্মসূচি

বাবার লাশ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে মেয়ে আয়েশা

আলোর পথ যুব সংঘের উদ্যোগে নৌকা ভ্রমন

৩২ বছরের সম্পর্কের টানে সৌদি থেকে গোয়াইনঘাটে কফিল, অসুস্থ কর্মচারীকে দেখতে ছুটে এলেন প্রবাসী মালিক

বিএনপি'র সাবেক চেয়ারপারসন মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ৮২ তম জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল

ডুয়েটের নতুন উপ-উপাচার্য ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমা

রূপগঞ্জে সড়ক দূর্ঘটনায় নরসিংদী সরকারী কলেজের ছাত্র মুয়াজ নিহত

সাতক্ষীরায় চেয়ারম্যান মিলনের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর

গাইবান্ধায় ১০০ পিস ইয়াবাসহ ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি ও তার ভাই আটক

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছে সালেহ মোঃ আদনান

অসুস্থ শিশু মুজাহিদকে নগদ অর্থ প্রদান করলেন আলোর পথে ফাউন্ডেশন পঞ্চগড়

আগামীকাল ডুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা মহারণ, ক্যাম্পাসজুড়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন

মনপুরার মনোয়ারা বেগম মহিলা কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ, শিক্ষাঙ্গনে উচ্ছ্বাস


এই সম্পর্কিত আরও খবর

দূর্গাপুরে বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া মাহফিল

মস্তক নত করেননি কভু: জন্মবার্ষিকীতে আপোষহীন নেত্রীর ফিরে দেখা

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দিলেন মঈন খান

মন্ত্রিত্ব ও দলীয় পদ ছাড়লেন মির্জা ফখরুল

‘দলীয় বৈঠকের জন্য সচিবালয় নয়’, বিএনপির সমালোচনায় জামায়াত

রিজভীই হচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

আগামীকালের মধ্যেই পদত্যাগ করছেন মির্জা ফখরুল

মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে জনগণ আর সুযোগ দেবে না : রিজভী

শিক্ষায় বাজেট শিক্ষাঙ্গন দখল করে চাঁদাবাজির বিস্তার করার জন্য: হামিদুর

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার চক্রান্ত চলছে: রিজভী