
শেখ রিফাদ মাহমুদ
১৫ আগস্ট ১৯৪৫। দিনাজপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া লাজুক মেয়েটি একদিন হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের রাজনীতির অবিসংবাদিত নেত্রী, তা হয়তো সেদিন কেউ ভাবেনি। শনিবার বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান বেগম খালেদা জিয়ার ৮১তম জন্মবার্ষিকী। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মহাপ্রয়াণের পর এটিই তাঁর প্রথম জন্মবার্ষিকী। আজ যখন জাতি তাঁকে স্মরণ করছে, তখন ফিরে তাকাতে হয় সেই গৃহকোণের শান্ত মেয়েটির দিকে, যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ফিনিক্স পাখি’।
গৃহকোণ থেকে রাজপথের অগ্নিকন্যা
পৈতৃক নিবাস ফেনীর ফুলগাজীতে হলেও বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদারের আদরের এই মেয়ের শৈশব-কৈশোর কেটেছে উত্তরবঙ্গের শান্ত পরিবেশে। ১৯৬০ সালে তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিয়ের পর তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বামী যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, তখন খালেদা জিয়া দুই শিশু পুত্রকে নিয়ে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হন। সেই দীর্ঘ নয় মাসের বন্দিজীবন এবং শত্রুবেষ্টিত অবস্থায় সন্তানদের আগলে রাখার মানসিক দৃঢ়তাই হয়তো তাঁকে ভবিষ্যতের আপোষহীন নেত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি বা বিএনপি প্রতিষ্ঠা করলেও খালেদা জিয়া ছিলেন পর্দার আড়ালে স্বামীর ছায়াসঙ্গী হয়ে এক ধ্রুপদী বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে বিধবা খালেদা জিয়ার জগতটি ওলটপালট হয়ে যায়। দলের সেই ক্রান্তিলগ্নে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবিতে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। গৃহকোণের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তিনি নামলেন রাজপথের ধুলোবালিতে।
স্বৈরাচার বিরোধী আপোষহীন সংগ্রাম
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আসল পরীক্ষা শুরু হয়। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ এই নয়টি বছর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের স্বর্ণযুগ। এরশাদ সরকার বিভিন্ন সময় নির্বাচনের টোপ দিলেও ১৯৮৬ সালে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, "এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়।" তিনি বলেছিলেন, "যারা এই নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে।" তাঁর এই একক ও সাহসী সিদ্ধান্তই তাঁকে জনগণের কাছে 'আপোষহীন নেত্রী' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৮৭ সালে হোটেল পূর্বাণী থেকে গ্রেফতার কিংবা বারবার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি থেকেও তিনি আন্দোলনের নির্দেশ দিয়ে গেছেন। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটে, যা ছিল মূলত তাঁর আপোষহীন অবস্থানের বিজয়।
গণতন্ত্রের নবজাগরণ ও রাষ্ট্রনায়ক খালেদা জিয়া
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে। নিজে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানিয়ে ৬ আগস্ট দ্বাদশ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন।
নারী শিক্ষার নীরব বিপ্লব ও অর্থনৈতিক সংস্কার
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের সবচেয়ে বৈপ্লবিক সাফল্য হলো নারী শিক্ষার প্রসার। ১৯৯৪ সালে চালু হওয়া 'Female Secondary School Assistance Program (FSSAP)' গ্রামীণ বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো বদলে দেয়। উপবৃত্তির সাথে জুড়ে দেওয়া 'এসএসসি পরীক্ষার আগে বিয়ে করা যাবে না' শর্তটি বাল্যবিবাহ রোধে জাদুকরী ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৯৯৩ সালে যেখানে মাধ্যমিকে মেয়েদের পাসের হার ছিল মাত্র ৩০.১১%, তা ১৯৯৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭১.৫৮%-এ। আজ বিশ্বমঞ্চে নারী ক্ষমতায়নের যে গল্প আমরা বলি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তিনিই।
পাশাপাশি তাঁর সরকার আধুনিক অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা করে। ১৯৯১ সালে 'মূল্য সংযোজন কর' (VAT) প্রবর্তন বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। ১৯৯৬ সালে টেলিযোগাযোগ খাতের একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছে দেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্তটিও ছিল তাঁরই।
সংঘাতময় রাজনীতি, ট্র্যাজেডি ও কারাজীবন ২০০১ সালে বিশাল জয় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেও তাঁর জীবনের শেষ দুই দশক কেটেছে সীমাহীন রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে। ১/১১-এর সময় সাব-জেলে বন্দি অবস্থায় বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, "বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার সব।" ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন এবং ২০১৩ সালের 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি'র সময় অবরুদ্ধ অবস্থায় তাঁর সেই ক্ষোভ "আমি বন্দি নই, সারা দেশই আজ কারাগারে পরিণত হয়েছে" ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি অবরুদ্ধ অবস্থায় ছোট ছেলে কোকোর মৃত্যুসংবাদ তাঁকে পাথর করে দেয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। নাজিমউদ্দিন রোডের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ৭৩ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর দিন কেটেছে চরম অবহেলায়, যেখানে তাঁর লিভার সিরোসিসসহ অন্যান্য রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
মহাকালের পথে দেশনেত্রী
মহাকালের অমোঘ নিয়মে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। পেছনে রেখে গেছেন এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা আর কোটি মানুষের বোবা কান্না। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমা নিয়ে হয়তো নানামুখী মূল্যায়ন হবে, কিন্তু গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আর দেশপ্রেমের প্রশ্নে তাঁর যে নিরঙ্কুশ আত্মত্যাগ, তা ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। তাঁরই প্রবর্তিত শিক্ষায় আলোকিত হয়ে আজ যে লক্ষ লক্ষ নারী সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, তারাই এই নেত্রীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। জন্মবার্ষিকীর এই লগ্নে জাতি গভীর শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছে সেই লৌহমানবীকে, যিনি শত প্রলোভন, স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু আর নির্জন কারাবাসের মুখেও কোনোদিন মস্তক নত করেননি। তিনি আজ দৃশ্যত আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আপোষহীন চেতনার কোনো মৃত্যু নেই। শান্তিতে ঘুমান দেশনেত্রী, শান্তিতে ঘুমান গণতন্ত্রের মা।
লেখক: শেখ রিফাদ মাহমুদ, ভিপি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন







































