
আরাফাত আলী,স্টাফ রিপোর্টার :
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলায় চলমান একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, তথ্য গোপন, কমিশন বাণিজ্য ও দুর্বল তদারকির অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে বরং নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ নয়। এর আগে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা এবং পরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ বিতরণ এবং বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীতে তিনি সাতক্ষীরা সদর থেকে বদলি হয়ে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল কালিগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করেন।
সম্প্রতি কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের হরিখালি থেকে মৌখালী অভিমুখে নির্মাণাধীন একটি গ্রামীণ সড়কের কাজ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে পাশের খালের গোড়া কেটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই মাটি রাস্তায় ফেলার পর আবার খালেই ধসে পড়ছে। এতে রাস্তার স্থায়িত্ব নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম আড়াল করতে পরে খালে পানি তুলে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, “যেভাবে মাটি দেওয়া হচ্ছে তাতে রাস্তা কতদিন টিকবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।”
আরেক বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “খাল কেটে রাস্তা করলে শেষ পর্যন্ত খালও থাকবে না, রাস্তাও থাকবে না।
এস্কেভেটর চালক নাইম জানান, তিনি ঠিকাদারের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছেন।
ঠিকাদার আব্দুল হান্নান বলেন, “পিআইও ও ইউএনওর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। কোনো অনিয়ম থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জবাব দেবে।
এ বিষয়ে পিআইও মফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন,প্রকল্প শেষ হলে তখন বলা যাবে। এখন কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এছাড়া অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
সাইনবোর্ড নেই, তথ্যেও অস্পষ্টতা স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ও ৬ টন বরাদ্দ রয়েছে বলে জানা গেলেও প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এদিকে একই ইউনিয়নের মহেশ্বরপুর এলাকায় সম্ভখালি খালের ওপর প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কালভার্ট নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যথাযথ তদারকি না থাকলে এই প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কালিগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরেই কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, টিআর, কাবিখা, কাবিটা এবং অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ কখনো "অফিস খরচ", কখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে আদায় করা হয়।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সভাপতিদের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের পরিবর্তে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বিল উত্তোলন ও অর্থ বণ্টনের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয়দের দাবি, এতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন জনপ্রতিনিধির অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত না করে কেবল প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালেও মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ "অফিস খরচ" হিসেবে কেটে রাখার অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়ম এবং প্রকল্প তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দকৃত ঢেউটিন ও গৃহনির্মাণ সহায়তা বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ প্রকাশিত হলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। কিন্তু যদি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত না হয়, তাহলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং উন্নয়নের সুফল দুটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
পিআইও মোঃ মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।




























