
আরাফাত আলী,স্টাফ রিপোর্টার :
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও স্বজনদের যেখানে স্বস্তি পাওয়ার কথা, সেখানে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ (সামেক) হাসপাতালে সেবার নামে ভোগান্তি আর অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ যেন পিছু ছাড়ছে না। এবার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) নিতে গিয়েও টাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং গালাগালের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় কথিত স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
আর শিশু ওয়ার্ডে একই কাজে নেওয়া হচ্ছে ২০০ টাকা পর্যন্ত। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
মর্জিনা নামের এক রোগী অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার সময় কথিত স্বেচ্ছাসেবীকে ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শুধু তাই নয়, শিশু ওয়ার্ডে ছাড়পত্র দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে। তার পদ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হলেও তিনি নিয়মিত ওয়ার্ড বয়ের দায়িত্বও পালন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাড়পত্রের ফাইল ছাড়াতে তার মাধ্যমে ২০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।
হাসপাতালের সপ্তম তলায় গিয়ে নাসরিন নামের এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথিত স্বেচ্ছাসেবীদের হট্টগোলের ঘটনা দেখা যায়। সেখানে গিয়ে জানা যায়, ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য তার কাছে ৫০ টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা দিতে অপারগতা জানালে তাকে ইচ্ছেমতো গালাগাল করেন স্বেচ্ছাসেবী পরিচয়দানকারী নুরজাহান ও আব্দুর রহমান।
ঘটনার সময় ওই দুই স্বেচ্ছাসেবীর কাছে টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা দাবি করেন, বিষয়টি হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন। তাদের কোনো বেতন নেই, তাই এই টাকা নিয়েই তারা চলেন বলেও জানান তারা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাড়পত্র দেওয়ার সময় তারা রোগীদের কাছ থেকে ৫০-১০০ টাকা করে নেন। একই সঙ্গে শিশু ওয়ার্ডে ২০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগের কথাও তারা উল্লেখ করেন।
‘আমরা ৫০-১০০ টাকা নিই, শিশু ওয়ার্ডে ২০০ টাকা করে নেন। কিন্তু সেখানে যেয়ে কাউকে কথা বলতে দেখা যায়না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিশু ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বেলাল হোসেন বলেন,
“ভাই, সারাদিন কষ্ট করি কোনো প্রকার বেতন ছাড়া। প্রতিদিন ছাড়পত্র কয়টা হয়? পাঁচ-সাতটা। দুইশত টাকা করে নিলে ১ হাজার ৪০০ টাকা হয়। আমরা ৩-৪ জন ওই টাকা ভাগ করে নিই।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫-৭টি ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে ২০০ টাকা করে আদায় হলে মোট অর্থের একটি অংশ কয়েকজনের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়েই প্রশ্ন উঠছে সরকারি হাসপাতালে রোগীর ছাড়পত্র দেওয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা কি তাহলে বেতনহীন কথিত স্বেচ্ছাসেবীদের আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে? আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জেনেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না?
হাসপাতালে শুধু ছাড়পত্রের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগই নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিয়েও রয়েছে রোগী-স্বজনদের বিস্তর অভিযোগ।
সদরের বল্লী ইউনিয়নের আখড়াখোলা গ্রামের রায়হান বলেন, তার বাচ্চার শুধু রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করানো হয়েছে। চিকিৎসক আরও তিনটি পরীক্ষা করতে বলেন এবং নার্সের পরামর্শে তারা ডক্টর ল্যাবে পরীক্ষা করান। সেখানে তাদের কাছ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়, অথচ ৬ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রায়হানের অভিযোগ, হাসপাতালের বাথরুমগুলোর অবস্থা এতটাই নাজুক যে রোগী ও স্বজনদের অনেক সময় বাড়িতে গিয়ে বাথরুম করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাথরুমের খুব বাজে অবস্থা। বাড়ি চলে যায় বাথরুম করার জন্য। এখানে যারা আছে তাদের হয় কাপড়ে করতে হবে, তা না হলে পলিথিনে করতে হবে।
অন্যদিকে মৌতলার রনি জানান, তার সন্তান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এখানে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে এবং এমবিবিএস চিকিৎসকরা ঠিকমতো থাকেন না বলে তার অভিযোগ। তার ভাষায়, টাকা ছাড়া এখানে সেবা নেওয়া কষ্টকর।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার হালিম হোসেন বলেন, ডায়াবেটিস পরীক্ষা কিংবা ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য ফাইল আটকে রেখে টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।
তিনি বলেন, এসব অভিযোগের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, হাসপাতালের পরিচালক চাইলে বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু পরিচালক কোনো কারণে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না এ বিষয়টি তার বোধগম্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কুদরত-ই-খোদার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সরকারি হাসপাতালের ছাড়পত্র দেওয়া একটি প্রশাসনিক সেবা। এ সেবার জন্য রোগীর কাছ থেকে নির্ধারিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়। তাহলে স্বেচ্ছাসেবীর পরিচয়ে কারা রোগীর ফাইল নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাদের সেখানে দায়িত্ব দিল কে, আর তাদের টাকা নেওয়ার বিষয়টি হাসপাতালের কোন কর্মকর্তা জানেন—এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
আরও গুরুতর প্রশ্ন হলো, হাসপাতালের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কীভাবে ওয়ার্ড বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন এবং রোগীর ছাড়পত্রের ফাইল নিয়ে অর্থ আদায়ের সুযোগ পাচ্ছেন?
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ এটি শুধু অনিয়ম নয় সরকারি হাসপাতালের সেবাব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার জন্যও গুরুতর হুমকি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে ছাড়পত্রের ফাইল আটকে টাকা আদায়, কথিত স্বেচ্ছাসেবীদের ভূমিকা, শিশু ওয়ার্ডে অর্থ আদায়, বেসরকারি ল্যাবে পরীক্ষা পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং হাসপাতালের বাথরুমের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।





























